মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী
মাওলানা নূর মুহাম্মদ আজমী ১৯০০ সালে পূর্ববঙ্গের ফেনী জেলার নেয়াজপুর (দাগনভূঞা থানার) সিলোনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ আলী আজম এবং মাতা শেখ রহীমুন নেসা। ছোটবেলায় তিনি কুরআন শিক্ষা লাভ করেন পিতার নিকট থেকে, সঙ্গে বাংলা ও ফার্সি ভাষার প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন। পরে নৈশ বিদ্যালয় এবং স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়াশোনা চালিয়ে যান। তিনি মীরসরাই-এর আবুর হাট মাদ্রাসায় জামাতে দ’airবা পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯২৫ সালে তিনি চট্টগ্রামের দারুল উলুম মাদ্রাসা-তে ভর্তি হন এবং আলিম ও ফাজিল ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়াও নিজ উদ্যোগে কলকাতা ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি ও ঢাকার আলিয়া লাইব্রেরি থেকে কুরআন, হাদিস, উর্দু, ফার্সি, বাংলা সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন চালিয়ে যান।
শিক্ষকতা ও মাদ্রাসা সংস্কার
শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর ১৯২৭ সালে বালুয়া চৌমুহনী মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯২৮–১৯৪৩ সালে তিনি ফেনী আলিয়া মাদ্রাসা-তে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনার উদ্দেশ্যে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন। ১৯৪৫ সালে এক কমিশন গঠন করা হয়, যেখানে মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার নিয়ে কাজ করার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই সময়ে তিনি উর্দু ভাষায় “মাদারিসে আরবিয়া কা নেজামে তালীম” রচনা করেন, যা মাদ্রাসা শিক্ষার নতুন কাঠামো প্রস্তাব করার উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল।
আধ্যাত্মিক জীবন ও সংযুক্তি
মাওলানা আজমী প্রখ্যাত পণ্ডিত রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি-এর খলিফা জমিরুদ্দিন আহমদের মুরীদ ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থায় সক্রিয় ছিলেন এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা ও শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ জমিয়াতুল মুদার্রেছীন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
লেখালেখি ও সাহিত্যিক কাজ
মাওলানা আজমী বাংলা ও উর্দু ভাষায় ইসলামী চিন্তাধারার বিশ্লেষণাত্মক গ্রন্থ রচনায় দক্ষ ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
-
“হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস” — হাদিস শাস্ত্রের বাংলা বিশ্লেষণ।
-
“মেশকাত শরীফ” (১১ খণ্ড) — মেশকাত শরীফের বাংলা ব্যাখ্যা।
-
“ইসলামী অর্থব্যবস্থার মৌলিক ধারনা” — ইসলামের অর্থনীতি বিষয়ে মৌলিক ধারণা।
-
অন্যান্য গ্রন্থে ইসলামের সামাজিক ব্যবস্থা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রনীতি, আদবেত তারবিয়াত, তাফসীর ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত। যেমন-
-
তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকাসমূহে নিয়মিত লিখতেন এবং পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তার রচনাসমূহের মধ্যে রয়েছে:[৯][১০]
- উনবিংশ শতাব্দীর আলেম সমাজ ও রাজনীতি
- খোলাফায়ে রাশেদিনের আর্দশ
- ইসলামের সমাজ ব্যবস্থা
- ইসলাম ও পাশ্চাত্য জগত
- ইসলামের ভূমি ব্যবস্থা
- বাংলা সাহিত্যে ইসলামের প্রচার
- নেজামে তালীম
- আদাবে তারবিয়ত
- তারীখে ফনুনাত তাফসীর
সামাজিক অবদান
মাওলানা আজমী শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার প্রস্তাবক ও সক্রিয় শিক্ষক হিসেবে স্মরণীয়। তার নামে নূর মোহাম্মদ আজমী ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কল্যাণে কাজ করে।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী ১৬ আগস্ট, ১৯৭২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষা জগতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়, কারণ তিনি বাংলা ভাষায় ইসলামী গ্রন্থপ্রচারে এবং ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।
তাঁর শিক্ষাদর্শন, সাহিত্যিক অবদান এবং মাদ্রাসা সংস্কারে সক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশের শিক্ষাজগতে দীর্ঘদিন স্মরণীয় থেকে যাবে।
সূত্র
ইসলামী ব্যক্তিত্ব নোয়াখালীতে ইসলামের বিকাশ নোয়াখালীর আলেম ফেনীতে ইসলাম ফেনীর ওলামায়ে কেরাম মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী
Last modified: নভেম্বর ১৯, ২০২৫