নোয়াখালীর সাহিত্যভুবনে যাঁরা নিজস্ব কণ্ঠস্বর ও আঞ্চলিক চেতনার মাধ্যমে আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছেন, তাঁদের মধ্যে “নোয়াখাইল্যা সনেট” একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সচেতন সাহিত্যস্রষ্টা ও সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে। একই সঙ্গে একজন নিষ্ঠাবান সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে জনসেবায় তাঁর অবদান তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

কবি নোয়াখাইল্যা সনেট জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, নোয়াখালী জেলার সদর উপজেলাধীন (বর্তমানে সুবর্ণচর) চরবাটা ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামে। তিনি জন্মসূত্রে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার—ইছমাইল হাজী বাড়ী—এর সন্তান। তাঁর পিতা ছিলেন মরহুম মোহাম্মদ ইব্রাহীম (খাজা সাহেব) এবং মাতা মোসাম্মৎ জাহানারা বেগম। পিতামহ মরহুম আবদুল আলী। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। পারিবারিক শিষ্টাচার, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যচিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।

শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মনোযোগী ও ধারাবাহিক। স্থানীয় হাজীবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি সম্পন্ন করার পর তিনি আর.জি. হাই স্কুল থেকে ১৯৮৮ সালে এসএসসি পাশ করেন। এরপর সরকারি মুজিব কলেজ, কোম্পানীগঞ্জ থেকে ১৯৯১ সালে আইকম, এবং নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ১৯৯৩ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে বিএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায় তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে এমএ এবং পরবর্তীতে ২০০৮ সালে এলএলবি (ফাইনাল) পাশ করেন। সমাজবিজ্ঞান, আইন ও মানবিক শিক্ষার এই সমন্বয় তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাকে দিয়েছে পরিপক্বতা ও বিশ্লেষণধর্মী গভীরতা।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা, এনজিও এবং বিভিন্ন জাতীয় ও মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি বাংলাদেশের ৪৭টি জেলা ভ্রমণ করেন, যা তাঁকে দেশের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা ও মানুষের সুখ-দুঃখ ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়। এই অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্য রচনায় বাস্তবতা ও মানবিকতার শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।

২০০৪ সালের ১ নভেম্বর তিনি নোয়াখালী জেলা প্রশাসনে ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। দক্ষতা ও সততার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর তিনি ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি মানিক্যনগর ইউনিয়ন ভূমি অফিস, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালীতে কর্মরত। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি সাহিত্যচর্চা ও সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে কখনো বিচ্ছিন্ন করেননি।

তার সাহিত্যযাত্রা শুরু হয় ১৯৮৭ সাল থেকেই। কবিতা তাঁর প্রধান মাধ্যম হলেও তিনি ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনায়ও সক্রিয়। আঞ্চলিক ভাষা, নোয়াখালীর জীবনবোধ, গ্রামীণ সংস্কৃতি, প্রেম, বেদনা ও সামাজিক অসংগতি তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। “নোয়াখাইল্যা সনেট” নামটি তাঁর কবিসত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা স্থানীয় পরিচয়কে গর্বের সঙ্গে বহন করে।

তিনি একজন নিবেদিত সংস্কৃতিকর্মী, গীতিকার ও সংগঠক। বহু মঞ্চনাটকে অভিনয় করে তিনি স্থানীয় নাট্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে তিনি বৈশাখী থিয়েটার নোয়াখালী-এর সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতি, নোয়াখালী জেলা শাখার নির্বাচিত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, যা তাঁর নেতৃত্বগুণ ও সহকর্মীদের আস্থার প্রতিফলন।

ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন দায়িত্বশীল স্বামী ও পিতা। তাঁর দাম্পত্য জীবনে রয়েছে এক কন্যা ও দুই পুত্রসন্তান। পরিবার, চাকরি ও সাহিত্য—এই তিনের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক ভারসাম্যপূর্ণ জীবন।

সব মিলিয়ে নোয়াখাইল্যা সনেট একজন এমন মানুষ, যিনি কলম ও কর্ম—উভয়ের মাধ্যমে সমাজকে স্পর্শ করেছেন। তাঁর জীবন ও সাহিত্য নোয়াখালীর মাটি ও মানুষের কথা বলে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window