নোয়াখালীর ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বাকি একটি আসনে জয় পেয়েছে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মনোনীত প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত বৃহস্পতিবার রাতে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। ঘোষিত ফল অনুযায়ী জেলার ছয়টি আসনেই ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি পাঁচটি আসনে তাদের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
নোয়াখালী-১: এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের জয়
নোয়াখালী-১ (চাটখিল ও সোনাইমুড়ী আংশিক) আসনে বিএনপির প্রার্থী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন পেয়েছেন ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৩৩ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র প্রার্থী মোহাম্মদ ছায়েফ উল্যাহ পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৩৬ ভোট। এ আসনে দুই প্রধান প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৭৯৭। শুরু থেকেই এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠলেও শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন বিএনপির প্রার্থী।
নোয়াখালী-২: অল্প ব্যবধানে জয়
নোয়াখালী-২ (সেনবাগ ও সোনাইমুড়ী আংশিক) আসনে জয় পেয়েছেন বিএনপির জয়নুল আবদিন ফারুক হোসেন। তিনি পেয়েছেন ৮৩ হাজার ৯৯২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া পেয়েছেন ৬৭ হাজার ৫৪ ভোট। এ আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ছিল ১৬ হাজার ৯২৮ ভোট, যা জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে কম। ফলে এ আসনটি ছিল সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর একটি। শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থী ব্যবধান ধরে রেখে জয় নিশ্চিত করেন।
নোয়াখালী-৩: বরকত উল্যাহ বুলুর শক্ত অবস্থান
নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. বরকত উল্যাহ বুলু পেয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ৩১ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. বোরহান উদ্দিন পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৪১ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ১৭ হাজার ৯০। এ আসনে ভোট গণনার শুরু থেকেই বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধান বজায় থাকে। বেগমগঞ্জে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
নোয়াখালী-৪: সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়
নোয়াখালী-৪ (সদর ও সুবর্ণচর) আসনে বিএনপির মো. শাহজাহান পেয়েছেন ২ লাখ ১৯ হাজার ১৮২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের ইসহাক খন্দকার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৯ ভোট। এ আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ৭০ হাজার ১৯৩ ভোট, যা জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ। ভোটের এই বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে যে এ আসনে বিএনপি প্রার্থীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সদর ও সুবর্ণচরের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভোটারদের সমর্থন তাঁর পক্ষে একতরফা হয়ে ওঠে।
নোয়াখালী-৫: স্বস্তিদায়ক জয়
নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও সদর উপজেলার দুই ইউনিয়ন) আসনে বিএনপির মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৮ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. বেলায়েত হোসেন পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার ৪৫৩ ভোট। এ আসনে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৩৫৫ ভোট। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে থাকায় এ আসনেও দলটি স্বস্তিদায়ক জয় পায়।
নোয়াখালী-৬: একমাত্র এনসিপির জয়
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে জয় পেয়েছেন এনসিপির প্রার্থী আব্দুল হান্নান মাসউদ। তিনি পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৯৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাহবুবের রহমান শামীম পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২১ ভোট। এ আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ২৭ হাজার ৮৭৮ ভোট। জেলার একমাত্র এ আসনেই বিএনপি পরাজিত হয়েছে। ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমর্থন এবং স্থানীয় ভোটারদের আস্থাই এনসিপি প্রার্থীর জয়ে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘোষিত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নোয়াখালীর ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয় পেয়ে বিএনপি জেলায় শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশেষ করে নোয়াখালী-৪ আসনে মো. শাহজাহানের বিপুল ব্যবধানের জয় দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটব্যাংকের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ব্যবধানে জয় এসেছে নোয়াখালী-২ আসনে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তীব্র।
জেলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। পাঁচটি আসনে জয় পাওয়া মানে স্থানীয় রাজনীতিতে বিএনপির প্রভাব এখনো সুদৃঢ়। তবে নোয়াখালী-৬ আসনে এনসিপির জয় ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিও নির্দিষ্ট এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
ভোটের ব্যবধানের দিক থেকে সবচেয়ে বড় জয় ৭০ হাজার ১৯৩ ভোটের, আর সবচেয়ে কম জয় ১৬ হাজার ৯২৮ ভোটের। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, কিছু আসনে ভোট ছিল একতরফা, আবার কিছু আসনে ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।
সব মিলিয়ে নোয়াখালীর এবারের নির্বাচনী ফলাফল স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। পাঁচটি আসনে বিএনপির জয় দলটির জন্য বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, আর একটি আসনে এনসিপির জয় তাদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দিয়েছে।
Last modified: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬