সোনাইমুড়ী: ধর্ম, শিক্ষা ও বীরের ইতিহাসে সমৃদ্ধ নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী উপজেলা

নোয়াখালী জেলার উত্তরাংশে অবস্থিত সোনাইমুড়ী উপজেলা ইতিহাস, ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এক জনপদ। উপমহাদেশের বিখ্যাত ধর্মযাজক মরহুম মাওলানা কারামত আলী জইনপুরী থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের বীর যোদ্ধা রুহুল আমিন—এই মাটিতে জন্মেছেন বহু গর্বের সন্তান।

ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা

সোনাইমুড়ী অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা। ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত নবাবগঞ্জ জামে মসজিদ এবং ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দের বজরা শাহী জামে মসজিদ উপমহাদেশের স্থাপত্য ঐতিহ্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এছাড়া আমিশাপাড়া বারাহী মন্দির, শ্রী শ্রী গধাদর কুন্ড তীর্থস্থান, সোনাইমুড়ী কালি মন্দির দেবালয় ও শাহ মিয়াম্বর (রহ.) মাজার এখানকার ঐতিহ্যের অংশ।

এছাড়াও রয়েছে সমাজসেবামূলক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন সোনাইমুড়ী ফয়েজিয়া এতিমখানা (প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মাওলানা ফজলুল হক আল কাদেরী) এবং সোনাইমুড়ী অন্ধ কল্যাণ সমিতি (স্থাপিত ১৯৭৮ সালে)।

মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা

১৯৭১ সালে সোনাইমুড়ী উপজেলা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের অধীন। ২২ এপ্রিল পাক সেনারা সোনাইমুড়ীতে প্রবেশ করলে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১১ মে বোগদাদ (বগাদিয়া) এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে প্রায় ২০ জন পাক সেনা নিহত হয়, শহীদ হন ২ মুক্তিযোদ্ধা। ৭ ডিসেম্বর সোনাইমুড়ী শত্রুমুক্ত হয়।

শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান

সোনাইমুড়ী শিক্ষার ক্ষেত্রেও একটি ঐতিহ্যবাহী উপজেলা। এখানে রয়েছে চারটি কলেজ, ৩৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৯টি মাদ্রাসা। উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে সোনাইমুড়ী ডিগ্রী কলেজ (১৯৭০), সোনাইমুড়ী উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৭), বজরা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৯) এবং সোনাইমুড়ী হামিদিয়া আলিয়া মাদ্রাসা (১৯২৬)।
এর পাশাপাশি কাশীপুর মোহাম্মদীয়া ফাজিল মাদ্রাসা (১৮৮২) এবং অন্যান্য ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলের শিক্ষা বিকাশে বড় ভূমিকা রাখছে।

প্রশাসনিক কাঠামো

উপজেলাটি ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। ইউনিয়নগুলো হলো আম্বরনগর, আমিশাপাড়া, চাষীরহাট, জয়াগ, দেউটি, নাটেশ্বর, নদনা, বজরা, বড়গাঁও ও সোনাপুর। একমাত্র পৌরসভা হলো সোনাইমুড়ী পৌরসভা, যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে।

বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব

সোনাইমুড়ী বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক গুণী ব্যক্তিত্বের জন্মভূমি।
তাদের মধ্যে রয়েছেন—

  • বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন,

  • ড. মফিজুল ইসলাম (পাকিস্তানের প্রথম কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার),

  • ড. সাইদুল হক (সৌদি সরকারের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা),

  • মির্জা আলী আশরাফ (বাংলাদেশের প্রথম দিকের শিল্পপতি),

  • মেজর জেনারেল মঞ্জু,

  • ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর হোসেন,

  • এবং রাজনীতিবিদ নুরুল হক চৌধুরী (মেহেদী) ও মরহুম আবদুল হাদি।

অর্থনীতি ও জীবনধারা

সোনাইমুড়ীর অর্থনীতি কৃষিনির্ভর হলেও ব্যবসা, চাকরি ও রেমিট্যান্সও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি থেকে আয় ২৭.৩২%, ব্যবসা ১৬.৪৬%, চাকরি ১৮.১৫% এবং রেন্ট অ্যান্ড রেমিট্যান্স ১৪.৩৮%।
এখানে রয়েছে ৩০টি হাটবাজার, যার মধ্যে সোনাইমুড়ী হাট, জয়াগ বাজার, বজরা স্টেশন বাজার, মুসলিমগঞ্জ বাজারআমিশাপাড়া বাজার সবচেয়ে পরিচিত।

স্থানীয়ভাবে চালকল, বরফকল, বিস্কুট ও ওয়েল্ডিং কারখানাসহ ছোট শিল্প রয়েছে। কুটিরশিল্পের মধ্যে স্বর্ণশিল্প, লৌহশিল্প, মৃৎশিল্প, দারুশিল্প এবং বাঁশ-বেতের কাজ উল্লেখযোগ্য।

কৃষিতে প্রধান ফসল ধান, সুপারি, সরিষা, ডাল ও শাকসবজি। অতীতে তিল, তিসি, অড়হর ও চীনা চাষ হতো, যা এখন বিলুপ্তপ্রায়। প্রধান ফলের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, নারিকেল, কলা, পেয়ারা ও পেঁপে।

ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমৃদ্ধ সোনাইমুড়ী আজও নোয়াখালীর গর্ব এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও উন্নয়নের একটি উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।

সুত্র: wikipedia.org

মোঘল আমলের স্মৃতি বয়ে চলা ঐতিহাসিক বেগমগঞ্জ

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window