নোয়াখালী বিভাগ চাই আন্দোলন

নোয়াখালী জেলার ইতিহাস

নোয়াখালী বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জেলাগুলোর মধ্যে একটি। এর প্রাচীন নাম ছিল ভুলুয়া। ব্রিটিশ শাসনামলে, ১৭৭২ সালে, এখানে জেলা প্রশাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায় সমস্ত পূর্ববাংল তখন যে মূল ৪টি জেলা দ্বারা বিভক্ত হয়ে শাসিত হতো তার একটি ছিল নোয়াখালী। অন্য জেলাগুলো ছিল রংপুর, ঢাকা ও মোমেনশাহী বা ময়মনসিংহ। যদিও তখন এর নাম ছিল ভুলুয়া। এরপর ১৮৬৮ সালে, এক ভয়াবহ বন্যার পর নদীপথ পরিবর্তিত হয় এবং নতুন একটি খাল খনন করা হয়। সেই নতুন খাল থেকেই জেলার নতুন নাম হয় “নোয়াখালী”, অর্থাৎ “নতুন খাল”।  ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে ১৯১১ মালে বঙ্গ ভঙ্গ রদ হওয়ার আগে ১৯১০ সালে নোয়াখালী অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে ভাবনা শুরু হয় এবং তখনো এই অঞ্চলের ‍উন্নয়নের জনমত গড়ে উঠে। অনেকে নোয়াখালীর স্বতন্ত্র চিন্তার সূচনার সময় ধরা হয় এই সময়কে। জেলাশহরগুলোকে মহকুমা বলা হতো। ১৯৮৪ সালে সকল মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করলে ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার সৃষ্টি হয়।নোয়াখালীকে বলা হয় বৃহত্তর জেলা। কথিত আছে এই এলাকা এতটাই অগ্রসর ছিল কোনো একসময় দেশের ১৯ জেলার মধ্যে ১৭ জেলার ডিসি ছিল নোয়াখালীর।

নোয়াখালী বিভাগ আন্দোলন

১৯৯৪ সালে  নতুন করে বিভাগের জন্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম চৌধুরীর নেতৃত্বে নোয়াখালী বিভাগ চাই আন্দোলন শুরু করা হয়। ০১/১১/১৯৯৪ সাল থেকে শুরু হয় । ১০ দফা দাবি নিয়ে মাইজদী কোর্ট বিল্ডিং এর সামনে গণ অনশন কর্মসূচি পালন করা হয়। এখানে অন্যতম দাবী ছিল নোয়াখালী বিভাগ। বিশেষ করে বাংলাদেশ তখন মাত্র ৪টি বিভাগে বিভক্ত ছিল। ঢাকা. চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা। বর্তমান সিলেট বিভাগ তখন চট্টগ্রাম বিভাগের অংশ ছিল, রংপুর রাজশাহী বিভাগের অংশ ছিল এবং ময়মনসিংহ ছিল ঢাকা বিভাগের অংশ।

বিভিন্ন নথিতে দেখা যায়, একই বছর   এবং জাতিসংঘের সামনে কনকনে শীতের মধ্যেও দীর্ঘ ৬ ঘন্টা অনশন করে দাবী জানানো হয়।  এরপর ২০১২ সালে ‘নোয়াখালী বিভাগ বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত হয়। তবে এবারের মতো এমন জোরালো ছিল তখনকার কর্মসূচি।

সম্প্রতি (২০২৪, ২০২৫) এই আন্দোলন আরও বেশি জোরালো রূপ নেয়। জেলার বিভিন্ন পেশার মানুষ এতে যুক্ত হন। দেশীয় কর্মসূচির মধ্যে দেখা যায়, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবস্থান ধর্মঘট করা হয়। জেলার মাইজদীর মোহাম্মদীয় সড়ক এবং বেগমগঞ্জের চৌমুহনী চৌরাস্তায় মহাসড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচিও পালন করা হয়। আন্দোলন এখন শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

আন্তর্জাতিক কর্মসূচিও ছিলবিদেশেও, যেমন— লস অ্যাঞ্জেলেস ও যুক্তরাজ্যে, প্রবাসী নোয়াখালীবাসীরা এই দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘে স্মারকলিপি দেয়ার একটি সচিত্র সংবাদের কপিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্যাপশন ও নিউজসহ পাওয়া যায়। যদিও ছবির পাত্রদের নাম ও পত্রিকার নাম জানা সম্ভব হয়নি।

জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী নোয়াখালীবাসীদের একটি প্রতিনিধি দল জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে ৬ ঘণ্টাব্যাপী (স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত) হাড়কাঁপানো শীতে অনশন কর্মসূচি পালন করে। তারা জাতিসংঘ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। স্মারকলিপিতে নোয়াখালীকে বাংলাদেশের এক অবহেলিত ও উন্নয়নবঞ্চিত অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত পৃথক বিভাগ করার দাবি জানানো হয়।

২০২২ সালের ২৭ নভেম্বর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে বৃহত্তর ফরিদপুরকে নিয়ে ‘পদ্মা বিভাগ’ এবং কুমিল্লা ও আশপাশের জেলাগুলো নিয়ে ‘মেঘনা বিভাগ’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়। তখন আবারো নোয়াখালী বিভাগের দাবী মাঠে ঘাটে সর্বত্র উচ্চারিত হতে থাকে।

৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রি-নিকার বৈঠকে ফরিদপুর ও কুমিল্লা নামে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের পরপরই নোয়াখালী বিভাগ আন্দোলনের দাবিটি আবার জোরালো হয়ে ওঠে।

 বিভাগের পক্ষে মূল যুক্তি

আন্দোলনকারীদের মতে, নোয়াখালীকে বিভাগ করার পেছনে নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগুলো রয়েছে:

যুক্তির ক্ষেত্র কারণ
জনসংখ্যা ও আয়তন বৃহত্তর নোয়াখালী প্রায় ৮০ লাখ মানুষ অধ্যুষিত একটি বড় এলাকা, যা বিভাগীয় শহর হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
দূরত্ব ও প্রশাসনিক জটিলতা চট্টগ্রাম বিভাগীয় শহর থেকে নোয়াখালীর দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় প্রশাসনিক সেবা পেতে জটিলতা বাড়ে, এবং সময় ও অর্থের অপচয় হয়।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব নোয়াখালী অঞ্চল দেশে আসা বৈদেশিক মুদ্রার (রেমিট্যান্স) একটি বড় উৎস। শিল্প, বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য নোয়াখালী প্রাচীনত্ব, ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্বতন্ত্র উপভাষা ও শিক্ষাদীক্ষার দিক থেকে বিভাগ হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
সমন্বয়হীনতা শিক্ষাসংক্রান্ত কাজের জন্য কুমিল্লা বোর্ডে আসতে হয়, যা একটি সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি করে।
ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র এই অঞ্চলের ভূগোল ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা বিভাগ হওয়ার অন্যতম যোগ্যতা।
উপকূলীয় উন্নয়ন স্বতন্ত্র বিভাগ গঠিত হলে উপকূলীয় এলাকার প্রশাসনিক দক্ষতা ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

সবচেয়ে বড়ো বিষয় হলো, ব্রিটিশ বাংলায় যে চারটি বিভাগে এই পূর্ববাংলা বিভক্ত ছিলো। যা ছিল চার কালেক্টরেট এর অধীনে। বর্তমান বাংলাদেশের জেলা প্রশাসক পদবি ছিল তখনকার কালেক্টরেট। কারণ মুলত তাদের কাজ ছিল খাজনা আদায়ে নেতৃত্ব দেয়া। ভারতে এখনো এই পদটি বহাল রয়েছে। এখানে জেলা মর্যাদায় থাকলেও যেহেতু সারাদেশ বা পূর্ব বাংলাদেশ বর্তমান বাংলাদেশ ৪টি জেলায় বিভক্ত ছিল যা এখনকার সময়ের বিভাগ বা জোনের সমান। সহজ কথা হলে সে অনুপাতে ৪টি বিভাগ হলেও সেক্ষেত্রে নোয়াখালী বিভাগ থাকার কথা।  এই কারণে দেশে প্রথম ৪টি বিভাগ তথা ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা ঘোষনার পর থেকে নোয়াখালী বিভাগের প্রাসঙ্গিকতা সামনে চলে আসে।

 বিভাগীয় এলাকার প্রস্তাবনা ও সাম্প্রতিক সরকারি আলোচনা

কোন কোন  এলাকা নিয়ে নোয়াখালী বিভাগ হবে  এটা নিয়ে বিভন্ন মতামত রয়েছে।

১. নকল্যান্ড বা নোয়াখালী সংস্কৃতি অধ্যুষিত এলাকা : নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী সাথে কারো মতে চাঁদপুর, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের কিছু অংশ। যে অংশে নোয়াখালীয় সংষ্কৃতি রয়েছে। এই এলাকার মধ্যে বৃহত্তর নোয়াখালীর বাইরে চাঁদপুর জেলা ছাড়াও কুমিল্লার লাকসাম, লাঙ্গল কোট ও চৌদ্ধগ্রাম রয়েছে। রয়েছে চট্টগ্রাম জেলার মিরশ্বরাই উপজেলা। কেউ কেউ এই এলাকাকে মজার ছলে নকল্যান্ড বা নোয়াখালী সংস্কৃতি অধ্যুষিত এলাকা বলে থাকেন।

২. বৃহত্তর নোয়াখালী-কুমিল্লা-চাঁদপুর ও বি বাড়ীয়া: বর্তমান নোয়াখালী জেলাসহ কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলা। সহজ হিসাব হলো বৃহত্তর নোয়াখালী ও বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা তথা বর্তমান প্রস্তাবিত কুমিল্লা বিভাগকেই নোয়াখালী বিভাগ নামে চায়। যার সদর দপ্তর হবে নোয়াখালীতে।

৩. নোয়াখালীর ৩ জেলা: শুধু ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর। মানে বেশীরভাগ মানুষের প্রস্তাব হলো আসলে তারা কুমিল্লা ও নোয়াখালীর বাইরে বৃহত্তর নোয়াখালীর ৩ জেলা নিয়ে স্বতন্ত্র বিভাগটা চান।

আন্দোলনকারীরা জোরালোভাবে বলছেন যে, অন্য কোনো জেলা বা অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত না করে, শুধুই “নোয়াখালী” নামেই স্বতন্ত্র বিভাগ গঠিত হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)-র নেতারাও ক্ষমতায় এলে নোয়াখালীর স্বতন্ত্র বিভাগ গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। একই কথা বলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি।

নোয়াখালী বিভাগ আন্দোলন বাংলাদেশের বহুল আলোচিত আন্দোলনগুলোর মধ্যে একটি। এর উদ্দেশ্য বৃহত্তর নোয়াখালী নিয়ে একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত করা। প্রস্তাবিত কুমিল্লা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা হলে এই আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন আলোচনার নতুন করে সূত্রপাত হয়।

নোয়াখালী বাংলাদেশের প্রাচীনতম জেলাগুলোর মধ্যে একটি। স্থানীরা দীর্ঘদিন ধরে এটিকে বিভাগ ঘোষণার দাবি করে আসছে। বিভাগ ঘোষণার দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন, কর্মসূচি ও মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। এই আন্দোলনে জেলার বিভিন্ন পেশার মানুষ যুক্ত রয়েছেন।

সাধারণ মানুষের ভাষায় — “নোয়াখালী বিভাগ চাই” এখন শুধু একটি রাজনৈতিক দাবি নয়, আত্ম-পরিচয়, স্বীকৃতি ও উন্নয়নের প্রশ্ন।

তথ্যসূত্র:

উইকিপিডিয়া

www.shovonio.com

https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/c76nkkr2z2

বই: দেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশ- জাহাঙ্গীর আলম শোভন, ঢাকা ২০১৭

ছবিতে: ১৯৯৪ সালে নোয়াখালীতে অনশনের দৃশ্য

 

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window