পশ্চিমবঙ্গের নোয়াখালী সম্মিলনী
নাড়ী ছেড়া মানুষদের জীবনে সবচেয়ে বড় টান হলো স্মৃতি—অতীতের গ্রাম, কাদামাটির বাড়ি, নদীর পাড়, উৎসবের সুর। এই টান থেকেই জন্ম নেয় প্রবাসী সংগঠন, জন্ম নেয় স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার সম্মিলিত প্রয়াস। ঠিক তেমনই একটি সংগঠনের নাম “নোয়াখালী সম্মিলনী”, যার শিকড় বাংলাদেশের নোয়াখালী—কিন্তু যার শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত আজ কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, বিরাটি থেকে শুরু করে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গজুড়ে। ১৯৪৬ এর দাঙ্গা বা তার আগে পরে যারা নোয়াখালী থেকে সেখানে গিয়েছেন। তারা এই সংগঠন তৈরী করেছেন এবং একে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন।
বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে ১৯০৫ সালে কলকাতার অধিবাসী নোয়াখালীর মানুষেরা একত্রিত হওয়ার জন্য “নোয়াখালী সম্মিলনী” গঠন করেন । কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠন। এটি একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন, যা নোয়াখালীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে কাজ করে। প্রতিবছর শতশত পারিবারিক মুখ, সন্তানের হাত ধরে আসা প্রবীণ প্রবাসী, আর নতুন প্রজন্মের কর্মজীবী তরুণ—সবাই একত্রিত হয় একটি সেতুবন্ধনের আশায়। সেই সেতুবন্ধনের নামই নোয়াখালী সম্মিলনী। সম্প্রতি এই সংগঠনটি শতবর্ষ উদযাপন করেছে। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন করা (যেমন: কলকাতায় “নোয়াখালী উৎসব”)।
তারই ধারাবাজিকতায় ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনায় নোয়াখালী সম্মিলনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। সম্প্রতি সংগঠনটি তাদের প্রতিষ্ঠার ১শ বছর পূর্তি উদযাপন করে। তারা মোহনা নামে একটি স্মারক গ্রন্থও প্রকাশ করে।
লাল-টালির ছাউনিওয়ালা একটি গ্রামের বাড়ি, চারদিকে সবুজ, দূরে নিভৃত পথ—এই জলরঙে আঁকা কভারটিই বলে দেয় সংগঠনের আত্মা কোথায়। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নোয়াখালীর মাটির ঘ্রাণকে আবার ফিরিয়ে আনা—এই যেন ‘মোহনা’র ভাষা।
ইনার কভারে যে তথ্যগুলো আছে—বংশপরম্পরায় প্রজন্মদের নাম, দাদা-পরদাদের স্মৃতিচিহ্ন, রামনগরের মাটির গল্প—এসবই প্রমাণ করে যে সম্মিলনী শুধু সাংগঠনিক নয়, এটি এক বৃহৎ পরিবারের দলিল।
শ্রী কানুলাল সরকার প্রণীত স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে রামনগর গ্রামের অতীত, তাদের জমি-জমা, সংস্কৃতি, নদীভাঙন, শিক্ষা, গ্রামীণ মন্দির, জমিদারি, ও মানুষের সংগ্রাম।
এই স্মৃতিচারণই আজ সংগঠনের আত্মপরিচয় বহন করে।
কলকাতায় থাকা নোয়াখালী থেকে আগত মানুষের জন্য সম্মিলনী যেন এক “অন্য বাড়ি”—যেখানে উৎসব মানে কেবল সাজসজ্জা নয়, বরং শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দ।
প্রতি বছরই আয়োজন করা হয় বৃহৎ মিলন উৎসব—যেখানে মানুষজন পুরোনো বন্ধু-স্বজনের মতো মিলিত হয়। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, দেশভাগ-পরবর্তী যাত্রার গল্প, নোয়াখালীর লোকসংগীত, রীতি-নীতির পুনর্জাগরণ—সব মিলিয়ে এক হৃদয়স্পর্শী পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
‘মোহনা’র মতো বইগুলো শুধু নস্টালজিয়া নয়—প্রবাসী ইতিহাসের পাঠ্য। রামনগর, সোনাই, খলিলপুর, জেত্তলাত, অগ্রজদের গল্প—এ যেন প্রজন্মের সেতুবন্ধন। এই সংগঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—মানুষ।
যারা বহু বছর আগে দেশ ছেড়েও ভুলেননি স্বপ্নের গ্রাম ও জন্মভূমিকে। উত্তর ২৪ পরগনার নোয়াখালী সম্মিলনী শুধু একটি প্রবাসী সংগঠন নয়—এটি সেইসব মানুষের যৌথ স্মৃতি, যাদের শেকড় নোয়াখালীর মাটিতে গভীর।
শেকড় ভুলে গেলে মানুষ থাকে না। আর শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখতে হলে লাগে পরিবার—যার নাম নোয়াখালী সম্মিলনী।
বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামেও “নোয়াখালী জেলা সমিতি, ঢাকা”- ও নোয়াখালী সমিতি চট্ট্রগাম রয়েছে। বাংলাদেশের খুলনাসহ অন্যান্য জেলাতেও নোয়াখালী সমিতি রয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও নোয়াখালীবাসীদের এমন সংগঠন রয়েছে।
Last modified: নভেম্বর ২৫, ২০২৫