ড. মজহারুল হক (১৯১১–১৯৭৫) ছিলেন দেশের অর্থনৈতিক চিন্তা, গবেষণা ও নীতি নির্ধারণের এক অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। নোয়াখালীর সোনাপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিক্ষাবিদ ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা ও মেধার উজ্জ্বল পরিচয় দেন। তাঁর পিতা ছিলেন খান সাহেব সেরাজুল হক, যিনি পরিবারে শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম. এ. সম্পন্ন করার পর ড. হক ১৯৪০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে তিনি শুধু শিক্ষক নন, বরং গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক হিসেবেও নিজের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫২ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, যা সেই সময়ের একজন বাঙালি শিক্ষাবিদের জন্য বিরল কৃতিত্ব ছিল।
১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ছিলেন। পাশাপাশি ফজলুল হক মুসলিম হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবনের নৈতিক দিকনির্দেশনা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁর অবদান এখনো স্মরণীয়।
ড. মজহারুল হক কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ট্যারিফ কমিশনের অস্থায়ী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। এছাড়া, স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের কৃষি ঋণ বিভাগের উপদেষ্টা হিসেবেও তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
তিনি ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে দেশের বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনর্গঠনে দিকনির্দেশনা দেন। স্বাধীনতাত্তোর সময়ে কৃষি, শিল্প ও আর্থিক খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে তাঁর মতামত ও গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
ড. মজহারুল হক ১৯৭৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিন বছর পর, ১৯৭৮ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। তাঁর জীবনের কর্মধারা শুধু অর্থনীতির শিক্ষকতায় সীমিত ছিল না, বরং তিনি ছিলেন একাধারে গবেষক, নীতি বিশ্লেষক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথপ্রদর্শক।
আজও অর্থনীতি শিক্ষায় ও জাতীয় উন্নয়ন চিন্তায় ড. হকের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জ্ঞান ও দূরদর্শিতা কিভাবে একটি জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
Last modified: অক্টোবর ১২, ২০২৫