ফেনীর ফুলগাজীতে শত শত বছরের পুরোনো ঢোল মন্দির দীর্ঘদিন অবহেলা আর অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে জেলা প্রশাসক মো. আমিন উল আহসানের নজরে আসায় স্থাপনাটি আবার আলোচনায় আসে। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল আলিম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিসিঞ্জার চাকমাকে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করার নির্দেশ দেন। স্থানীয়রা আশা করছেন, এই উদ্যোগে মন্দিরটি তার প্রাচীন ঐতিহ্য ফিরে পাবে।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও প্রতিষ্ঠা
বাশুড়া গ্রামে অবস্থিত এই মন্দিরটির ইতিহাস প্রায় সাড়ে চার শতাব্দী পুরোনো। ধারণা করা হয়, প্রায় ৪৫০ বছর আগে জমিদার কীর্তি নারায়ণ চৌধুরী স্থানীয় জনকল্যাণ ও ধর্মীয় প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে সাত একর জায়গা খনন করে তৈরি করেন দুটি পাশাপাশি বড় দিঘী, যাদের একসঙ্গে বলা হয় জোড়া দিঘী। দুটি দিঘীর মাঝখানের উঁচু ভিটেতে তিনি নির্মাণ করেন দোল মন্দির, যা তখন থেকেই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
১৩০৫ বাংলা সনের চৈত্র মাসে মন্দিরটির সর্বশেষ নকশা পুনর্গঠন করেন রাজ শ্রী আহম্মদ আলী। এতে মন্দিরের কাঠামো আরও শক্তিশালী এবং সুদর্শন রূপ পায়। একসময় এই মন্দির ছিল এলাকার সংস্কৃতি, ধর্মীয় উৎসব ও পুরোনো বাঙালির সামাজিক জমায়েতের এক উজ্জ্বল কেন্দ্র।
ধর্মীয় তাৎপর্য ও উৎসবের ঐতিহ্য
দোল মন্দির ছিল মূলত মহাদেব পূজার স্থান। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই পূজায় অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসতেন। পূজার দিন মন্দিরের চত্বরে মানুষের ঢল নামত।
প্রতি বছর ১ বৈশাখে এখানে বসত বৈশাখী মেলা, যা একসময় ফুলগাজীর সবচেয়ে বড় জমায়েত হিসেবে বিবেচিত হতো। শুধু আশপাশের গ্রামই নয়, পাশের দেশ ভারতের ত্রিপুরা থেকেও মানুষ আসত। মেলার কেন্দ্র ছিল লোকসংগীত, ঢোলের তালে নৃত্য, নাট্য পরিবেশনা এবং বর্ণিল পসরা। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পণ্য যেমন মাটির পাত্র, বাশের তৈরি জিনিস, খেলনা, মিষ্টি, স্থানীয় হস্তশিল্প—সবই পাওয়া যেত।
সুরের মূর্ছনা, ঢোলের তালে তালে ছন্দ আর মানুষের উৎসবমুখর ভিড়ে মেলা হয়ে উঠত প্রাণবন্ত। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, মেলাটি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং একটি সামাজিক মিলনমেলার ভূমিকা পালন করত।
অবহেলা, লোককাহিনি ও ভূতুড়ে ভাব
৭০ দশকের পর থেকে মন্দিরটি ধীরে ধীরে মানুষের চোখের আড়ালে চলে যায়। সংস্কারের অভাব, অবহেলা আর সময়ের ক্ষয়ক্ষতি মন্দিরের চারপাশে জঙ্গল সৃষ্টি করে। মানুষের যাতায়াত কমে গেলে এলাকা একসময় প্রায় পরিত্যক্ত মনে হতে শুরু করে। স্থানীয়দের কাছে এটি “ভূতুড়ে” জায়গা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
এলাকার ষাটোর্ধ্ব দিলিপি চৌধুরী জানান, তিনি পরেশ চন্দ্র চৌধুরীর দুরসম্পর্কের বাগনে। ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে মামাবাড়িতে আসতেন বৈশাখী মেলা দেখতে। তাঁর মা বিল্লীবাসী, যিনি পরেশ চৌধুরীর বোনের জা, তাঁর কাছ থেকে তিনি শুনেছেন ঢোল মন্দিরে সতীদাহের গল্প। স্থানীয় প্রচলিত লোককাহিনি অনুযায়ী, এখানে কোনো একসময় সতীদাহের ঘটনা ঘটত এবং পরবর্তীতে আত্মহত্যার প্রবণতাও নাকি বেড়ে যায়। যদিও এসব কথা মূলত লোকমুখে প্রচলিত, তবে গল্পগুলো মন্দিরটিকে রহস্যময় করে তোলে।
মন্দিরের ভেতরে নাকি একটি গভীর সুড়ঙ্গ ছিল, যা ৭০ দশকের শুরুর দিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সংস্কার উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিসিঞ্জার চাকমা জানিয়েছেন, মন্দিরটি রক্ষার জন্য উপজেলা প্রশাসন এখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। মন্দির পরিষ্কার করা, কাঠামোর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্নির্মাণ, আশপাশের জঙ্গল অপসারণ—এসব কাজ ধাপে ধাপে চলছে।
জেলা প্রশাসক মো. আমিন উল আহসান বলেন, ঢোল মন্দির শুধু ইতিহাস বা ঐতিহ্যের স্মারক নয়, এটি ফুলগাজীর সৌন্দর্যও বাড়িয়ে দিয়েছে। সঠিকভাবে উন্নয়ন করা গেলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনস্থলে পরিণত হতে পারে। তিনি ভবিষ্যতে এখানে নিয়মিত বৈশাখী মেলা আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানান, যা এলাকার মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ফেরাতে সহায়তা করবে।
সমাপনী ভাবনা
দীর্ঘদিন হারিয়ে যাওয়া ঢোল মন্দির আবারও নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে। পুনরায় প্রাণ ফিরে পেলে এটি শুধু স্থানীয় নয়, বাইরের মানুষের জন্যও এক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
সুত্র: natunfeni.com
প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।
ভাষা শহিদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর
Last modified: ডিসেম্বর ১, ২০২৫