১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বাংলার প্রতিটি জেলায়ই বিক্ষোভ, ছাত্র ধর্মঘট, হরতাল ও জনমতের উত্থান দেখা গেলেও ফেনীর ভূমিকা স্বতন্ত্রভাবে উজ্জ্বল। ২১ ফেব্রুয়ারির ঢাকার রক্তাক্ত ঘটনার প্রতিক্রিয়া যখন পুরো পূর্ববাংলায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন ফেনী ছিল অন্যতম সাহসী ও সংগঠিত সংগ্রামের কেন্দ্র। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, ছাত্রাবাস থেকে হাটবাজার—ফেনীর মানুষ উঠে দাঁড়ায় মাতৃভাষার সম্মানের জন্য।

শহীদ দিবস পালনে ফেনীর অগ্রণী ভূমিকা

ঢাকায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি ৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা শহীদ দিবস পালনের আহ্বান জানান। তখন ফেনীর বহু সংগঠক, ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল। তাঁরা আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হলেও আন্দোলন থেমে যায়নি।

ফেনী কলেজের ছাত্ররা উদ্যোগ নিয়ে ৫ মার্চ সফলভাবে শহীদ দিবস পালন করেন। মিছিল, সমাবেশ, কালোব্যাজ ও শোকসভায় এ দিন ফেনী শোক ও প্রতিবাদের শহরে রূপ নেয়। বলা যায়, বায়ান্ন সালের পর থেকেই ফেনীর ছাত্রসমাজ ও জনতার মধ্যে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনের বীজ পাকা হতে থাকে। ভাষা আন্দোলন এখানকার রাজনৈতিক চেতনার বাঁকবদল ঘটায় এবং সংগঠিত গণরোষের মাধ্যমে মুসলিম লীগ সরকারের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

ঢাকায় নেতৃত্বে ছিলেন ফেনীর কৃতীসন্তানেরা

ফেনীর ভূমিকা শুধু জেলা বা মহকুমা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও নেতৃত্বের শীর্ষে ছিলেন এখানকার ছেলেরা।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম গাজীউল হক—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা, ভাষা সংগ্রামী, বামপন্থী রাজনীতির সক্রিয় সদস্য এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান।

১৪৪ ধারা ভঙ্গের দিনে ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে এগারোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন গাজীউল হক। এদিন তিনি অন্যতম প্রথম নেতাদের একজন হিসেবে আইন অমান্য করে রাস্তায় নামেন।

তাঁর রচিত গান—
“ভুলব না ভুলব না ভুলব না—এই একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না”
১৯৫4 সাল পর্যন্ত প্রভাতফেরিতে সুর ও মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয়েছে।

ঢাকায় ফেনীর সন্তানরা শুধু আন্দোলনে অংশ নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি—অনেকেই গ্রেফতারও হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন—

  • আবদুস সালাম, সম্পাদক, Pakistan Observer

  • হামিদুল হক চৌধুরী, রাজনৈতিক নেতা

  • সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার

  • চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান

  • যুবনেতা মাহমুদ নুরুল হুদা

  • ইউনুস চৌধুরী
    এছাড়াও অনেক ছাত্রনেতা গ্রেফতারি পরোয়ানার শিকার হন।

ফেনীর এই নেতৃত্ব ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের শক্তি ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

উল্লেখযোগ্য যে, এ সময় রাষ্ট্রনীতি ও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় ইংরেজি দৈনিক Pakistan Observer বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা গণমাধ্যম দমনের অন্যতম কুখ্যাত উদাহরণ। এই অন্যায় ফেনীর মানুষকে আরও সংগঠিত করে এবং সরকারি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রবল করে তোলে।

ফেনীতে আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে যাঁরা ছিলেন

ফেনীর সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল যাঁদের আত্মত্যাগ, দূরদৃষ্টি, নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক দক্ষতায়—তাঁদের উল্লেখ ছাড়া ইতিহাস অপূর্ণ থেকে যায়।
এই তালিকায় ছিলেন ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক সংগঠক, শিক্ষক ও সাধারণ জনগণ।

স্মরণীয় নামগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • খাজা আহমদ

  • কুমুদ দত্ত

  • কেএম শামসুল হুদা (ঘোপাল)

  • রফিক উদ্দিন মিঞা

  • শামসুল হুদা (ধনীকুণ্ডা)

  • এমএ জলিল

  • সৈয়দ আহমদ (পাঁচগাছিয়া)

  • সিরাজুল হক মজুমদার

  • রমজান আলী

  • আবু বকর সিদ্দিক

  • আবদুল হাফিজ বেচু মিয়া

  • ডা. সৈয়দ মুহাম্মদ এছাক

  • আমির হোসেন ও মোশাররফ হোসেন

  • ছিদ্দিক উল্লাহ, জুলফিকার হায়দার চৌধুরী, এমএ হানিফ

  • কাজী এবাদুল হক

  • ওবায়দুল হক (পরবর্তীতে এমপি)

  • ফরমান উল্লাহ খান

  • শিল্পী রুহুল আমিন গেদু মিয়া

  • এ. অদুদ, সম্পাদক, পথ

  • আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল জব্বার খদ্দর

  • আজিজ আহমেদ

এদের মধ্যে কেউ সংগঠক, কেউ বক্তা, কেউ মিছিলে সামনের সারিতে, কেউ লিফলেট বিলি করেছেন—কেউবা পুলিশের সাঁজোয়া বাহিনীর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন।

ফেনীতে এমনকি স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে বেলায়েত হোসেন ও কাজী ফজলুল হকও বাংলা ভাষার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন—যা দেখায় মাতৃভাষার দাবির গুরুত্ব দলীয় রাজনীতিকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল।

ফেনীর ভাষা আন্দোলন ছিল সংগঠিত, পরিকল্পিত এবং হৃদয়ের গভীর দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। শহর, গ্রাম, রাজনীতি, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি, ছাত্র—সব ক্ষেত্র মিলিয়ে ফেনী এক অনস্বীকার্য অংশ হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিজয়যাত্রায়।

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি বললে ঢাকার শহিদ মিনার মনে আসে—
কিন্তু সমানভাবে স্মরণযোগ্য ফেনীর রাস্তাঘাট, শ্লোগানে মুখর জনতা, এবং সেই সব নামহীন নায়কেরা, যারা বলেছিলেন—
“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই—রক্ত দিয়ে হলেও চাই।”

সূত্র : ফেনীতে ভাষা আন্দোলন

লেখক : ফিরোজ আলম

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window