বাংলা ভাষা আন্দোলনের বিস্তৃত ইতিহাসে ফেনী জেলার ভূমিকা এক উজ্জ্বল স্মারক। সেই প্রাচীনকাল থেকেই ফেনীর মানুষ স্বাধীনচেতা, সংগ্রামী ও প্রতিবাদী চরিত্রের পরিচয় রেখে গেছে। তাই ১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়েও ফেনী জেলার ছাত্র, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ অগ্রসেনানীর ভূমিকা পালন করেন।
সংগ্রামের ঐতিহাসিক পটভূমি
ইংরেজ শাসনের আমল থেকেই ফেনী অঞ্চল প্রতিরোধ ও বিদ্রোহের ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পর এ অঞ্চলের প্রথম শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি পান ফেনীর ছাগলনাইয়ার নিজকুঞ্জরার বীর শমশের গাজী। কৃষক পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি আত্মনির্ভরতা ও যোগ্যতায় চাকলা রোশনাবাদ অঞ্চলের শাসক হয়ে ওঠেন। ইংরেজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম ফেনীবাসীর স্বাধিকার চেতনায় নতুন জাগরণ আনে।
তেমনই আরেক সাহসী নাম মুহাম্মদ আলী চৌধুরী। তাঁর নেতৃত্বে ফেনী–নোয়াখালী উপকূলের লবণচাষী কৃষকরা কোম্পানি প্রশাসনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন। বিদ্রোহের অভিযোগে বিচার চলাকালে তিনি ১৭৯৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করে।
পাকিস্তান আন্দোলনেও ফেনী পিছিয়ে থাকেনি। দেশভাগের পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাঙ্গায় শহীদ হওয়া দাগনভূঞার দক্ষিণ আলীপুরের নজির আহমদ ফেনীর আরেক গর্ব। পাকিস্তানের পক্ষে ছাত্র আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।
ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি গঠন
দেশ স্বাধীনের মাত্র ১৭ দিন পরে অধ্যাপক আবুল কাশেম ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর “তমদ্দুন মজলিস” প্রতিষ্ঠা করলে ভাষা আন্দোলনের বীজ বপন হয়। দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে এই চিন্তা ও দাবি। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ড. নুরুল হক ভূঁইয়া, কবি ফররুখ আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং অন্যান্য শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীরা। এই সাংস্কৃতিক শক্তিই পরে ছাত্র–জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়।
প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে–গঞ্জে
১১ মার্চ ১৯৪৮ আন্দোলনের প্রথম গণবিস্ফোরণের দিন। ঢাকার আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ তৎকালীন ফেনী মহকুমাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে ছাত্ররা ধর্মঘট, মিছিল ও সভা করে। পাকিস্তান গণপরিষদে লিয়াকত আলী খানের উর্দুকেন্দ্রিক ভাষানীতির প্রতিবাদে ২৬ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটের ডাক যখন আসে, ফেনী থেকেও তাতে ব্যাপক সাড়া মেলে।
দ্রুত বুঝতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার—ভাষার দাবি আর কেবল ঢাকার ছাত্রদের নয়, সাধারণ মানুষের দাবি হয়ে উঠেছে। তাই ফেনীতে ১৪৪ ধারা জারি পর্যন্ত করতে হয়েছিল।
ফেনীতে ছাত্র ও শিক্ষকদের অগ্রগণ্য ভূমিকা
১৯৪৮-৫০ সালে ফেনী কলেজ ছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের একটি মূল ঘাঁটি। শিক্ষক–ছাত্রদের সংগঠন মজলিসের নেতৃত্বে কোব্বাদ আহমদ, সামছুল হক চৌধুরী, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং যুবনেতা খাজা আহমদ আন্দোলনে শীর্ষ ভূমিকা পালন করেন।
প্রথমে আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল ছাত্রসমাজে, পরে এতে যোগ দেয় প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, পেশাজীবী এবং গ্রামের সাধারণ মানুষ।
ধর্মঘট, মিছিল ও জনতার প্রতিক্রিয়া
১৯৪৮ সালে ফেনী শহরের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস বর্জন করা হয়—
-
ফেনী সরকারি পাইলট হাইস্কুল
-
সরকারি বালিকা বিদ্যালয়
-
সেন্ট্রাল হাইস্কুল
-
মডেল হাইস্কুল
-
ফেনী সরকারি কলেজ
-
জিএ একাডেমি
-
ফেনী আলিয়া মাদ্রাসা
ছাত্র–ছাত্রীরা মাইলব্যাপী শোভাযাত্রা বের করে শহরের অলিগলি ও প্রধান রাস্তা ঘুরে আবার সমাবেশে মিলিত হয়। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—উর্দু নয়, বাংলাই হবে রাষ্ট্রভাষা।
এই ঢেউ সোনাগাজী, ধলিয়া, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ধলিয়া হাইস্কুলের ছাত্রনেতারা ‘ভাষা তোরণ’ নির্মাণ করে আন্দোলনের প্রতীক গড়ে তোলেন।
জনসমর্থন ও গোপন সহায়তা
ভাষা আন্দোলন কেবল ছাত্র–শিক্ষক বা রাজনৈতিক নেতাদের সীমিত ছিল না। সাধারণ মানুষও নানা উপায়ে সংগ্রামকে সহায়তা করেন—
-
খাবার ও আশ্রয় দেওয়া
-
লিফলেট ছাপানো ও বিতরণ
-
মিছিল সংগঠনে সহায়তা
-
অর্থ দান
-
ধর্মীয় সমাবেশে সচেতনতা তৈরি
কামাল হাসান চৌধুরী স্মৃতিচারণে বলেছেন—অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি ঈদগাহ ও ওয়াজ মাহফিলে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে বক্তব্য দিতেন—রাজনীতি ও প্রতিবাদের সেই বীজ তার মধ্য থেকেই জন্ম নেয়।
১৯৪৮–১৯৫১ সালে ফেনীর ভাষা আন্দোলন ছিল ছাত্র–যুব–জনতার সম্মিলিত সংগ্রাম। প্রতিরোধ, মিছিল, ধর্মঘট, ১৪৪ ধারা উপেক্ষা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে ফেনী প্রমাণ করেছে, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে তারা সমগ্র বাঙালি জাতির অংশীদার।
Last modified: জানুয়ারি ৮, ২০২৬