ফেনীর পরশুরামে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা রাবার বাগান

ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী জয়ন্তীনগর গ্রামে ২০১০ সালে হাজি মো. মোস্তফা প্রায় ২৫ একর জায়গায় ১০ হাজার রাবার চারা রোপণ করেন। দীর্ঘ ১২ বছর পরিচর্যার পর বর্তমানে প্রায় ছয় হাজার গাছ থেকে নিয়মিত রাবার কষ সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি, ফেনীর একমাত্র এই রাবার বাগানটি পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

রাবার উৎপাদন ও সংগ্রহ প্রক্রিয়া

রাবার গাছ রোপণের ৭-৮ বছর পর থেকেই কষ সংগ্রহ শুরু হয়। রাবার গাছ ২৮-৩০ বছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে কষ দিতে সক্ষম। গাছ থেকে কষ সংগ্রহের জন্য গাছের গোড়া থেকে ৭০-৭৫ সেন্টিমিটার উপরে চারপাশে এক মিটার পরিমাণ কাটা হয়। কাটার নিচে মাটির তৈরি বাটি বসানো হয়, যাতে গাছ থেকে গড়িয়ে আসা কষ সেখানে জমা হয়। একটি গাছ থেকে দৈনিক প্রায় ৩০০-৫০০ গ্রাম কষ পাওয়া যায়। বর্তমানে বাজারদর অনুযায়ী প্রতি লিটার কষ ১৫০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রাবার কষ থেকে শুকনো রাবার শিট তৈরি করতে সর্বোচ্চ সাত দিন লাগে। রোলার মেশিনের মাধ্যমে কষ থেকে পানি বের করে ড্রিপিং শেডে শুকিয়ে ধুমঘরে পোড়া হয়। এরপর রাবারের ৫০ কেজি ওজনের বান্ডিল গুদামজাত করা হয়। বাগানের তত্ত্বাবধায়ক চায়ং মারমা জানিয়েছেন, সারা বছরই রাবার উৎপাদন হয়, তবে অক্টোবর-জানুয়ারি চার মাস সবচেয়ে বেশি কষ আহরণ হয়।

পর্যটন ও দর্শনার্থীদের আগ্রহ

হাজি মো. মোস্তফার রাবার বাগান মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে শুরু হলেও বর্তমানে এটি পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছে। সারিবদ্ধ গাছ, সবুজের সমারোহ, বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম এবং রাবার প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রক্রিয়া দেখার জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ অসংখ্য দর্শনার্থী এখানে আসেন। হাজি মোস্তফার ছেলে নুরুজ্জামান ভুট্টু জানান, চট্টগ্রামের কয়েকটি কোম্পানি বাগান থেকে রাবার কিনছে। প্রথম চালানে দুই টন ১৩০ কেজি রাবার বিক্রি হয়েছে, যার মূল্য দুই লাখ ১৩ হাজার টাকা।

উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানিয়েছেন, রাবার একটি লাভজনক কৃষিভিত্তিক শিল্প। দেশের পাহাড়ি এলাকায় অনেকেই রাবার বাগান করে অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু ফেনীতে এটি একমাত্র বাণিজ্যিক রাবার বাগান।

পরশুরাম রাবার বাগানের দর্শনীয়তা ও পরিচিতি

পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা শামসাদ বেগম জানান, ফেনী জেলায় এটাই প্রথম রাবার বাগান। বাগানটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সারি সারি গাছ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রক্রিয়া দেখার জন্য প্রতিদিনই অনেক দর্শনার্থী ভিড় জমান।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে শ্যামলী, ইউনিক, সোহাগ, গ্রিন লাইন, এস আলম, কেয়া ও সৌদিয়া বাসে ফেনী পৌঁছানো সম্ভব। এছাড়া কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে মহানগর গোধূলি বা তূর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেনে ফেনী যাওয়া যায়। ফেনী জেলা থেকে সিএনজি বা ইজিবাইকের মতো স্থানীয় যানবাহনে পরশুরাম হয়ে বাগানে পৌঁছানো যায়।

ভ্রমণ পরামর্শ

  • অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাস রাবার উৎপাদনের মৌসুম, এ সময় বাগান পরিদর্শনের জন্য উপযুক্ত।

  • ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বাগানে ঢোকার আগে মালিক পক্ষের অনুমতি নিতে হবে।

  • রাবার প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় উত্তপ্ত চুল্লির কাছে যাবেন না। চুল্লিতে সবসময় আগুন থাকে।

  • বাগানে কোনও দাহ্য পদার্থ যেমন: দিয়াশলাই, বিড়ি বা সিগারেট নেওয়া যাবে না। শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে অঘটনের সম্ভাবনা থাকে।

  • বাগানের কাছেই কাটা তারের বেড়ার মাধ্যমে ভারতের সীমান্ত এবং পরশুরাম রিজার্ভ ফরেস্ট অবস্থিত, তাই ট্র্যাকিংয়ের জন্য প্রস্তুতি নিলে চাইলে ট্রিপও করা যায়।

  • বাগানের ভিতরে যেখানে যেখানে সম্ভব, ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না।

 

সুত্র: jagonews24.com, vromonguide.com

প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।

ফুলগাজীর ৪৫০ বছরের প্রাচীন ঢোল মন্দির

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window