বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ফেনী জেলা একটি প্রাচীন জনপদ, যার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহ্য একে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সরাসরি এ জেলার মধ্য দিয়ে চলে যাওয়ায় অর্থনীতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ফেনীর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পাহাড়ের সবুজ বনানী, নদের স্রোতধারা এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনার সংযোগ এ জনপদকে দিয়েছে এক অভিনব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য।

ভৌগোলিক অবস্থান ও আয়তন

ফেনী জেলা বাংলাদেশের সাধারণ মানচিত্রে ছোট হলেও এর ভূমিকা অনন্য। উত্তরে কুমিল্লা, পূর্বে ত্রিপুরা (ভারত) ও চট্টগ্রাম জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও ফেনী নদীর মোহনা এবং পশ্চিমে নোয়াখালী জেলা ফেনীকে ঘিরে রেখেছে। জেলাটির আয়তন ৯২৮.৩৪ বর্গকিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা প্রায় ১৪ লক্ষ ৯৬ হাজার, যার মধ্যে পুরুষ ৭,২২,৬২৬ এবং নারী ৭,৭৩,৫১২ জন। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ১,৪৫১ জন।

ফেনী নামের উৎস

‘ফেনী’ নামটির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। মধ্যযুগের কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় ফেনী নদীকে ‘ফনী’ নামে উল্লেখ করা পাওয়া যায়। ষোড়শ শতকে কবীন্দ্র পরমেশ্বর নদী বেষ্টিত এই অঞ্চলের কথা লিখেছিলেন। মির্জা নাথানের ‘বাহরিস্তান-ই-গায়েবী’-তে ‘ফনী’ শব্দের উল্লেখ সময়ের ব্যবধানে ‘ফেনী’ হয়ে ওঠে। আঠারো শতকের কবি আলী রেজা এবং মোহাম্মদ মুকিমও তাঁদের রচনায় অঞ্চলটিকে ‘ফেনী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মূলত নদী ঘিরেই এলাকার নামকরণ।

প্রশাসনিক বিকাশ

মোগল আমলে অঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল আমীরগাঁও। নদী ভাঙনের কারণে থানা সদর পরিবর্তিত হয়ে প্রথমে খাইয়ারা, পরে ফেনী শহরে স্থাপিত হয়। ১৮৭৬ সালে ফেনী মহকুমার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু এবং ১৮৮১ সালে নবীনচন্দ্র সেনের প্রচেষ্টায় ফেনী শহর উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। স্বাধীনতার অনেক পরে, ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ফেনী মহকুমা সম্পূর্ণ জেলার মর্যাদা লাভ করে।

প্রাচীন মানব বসতি

ইতিহাস হিসেবে ফেনী শুধু নয়, নোয়াখালী অঞ্চলেও প্রাচীনতম বসতির চিহ্ন অন্যতম। ১৯৬৩ সালে ছাগলনাইয়া এলাকায় একটি পুকুর খননের সময় নব্যপ্রস্তর যুগের একটি প্রস্তর হাতিয়ার পাওয়া যায়, যা প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা হয়। এটি নির্দেশ করে, প্রাচীনকালেই এখানে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল।

ফেনীর পূর্বাঞ্চলী এলাকায় প্রাচীন শিলামূর্তির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যা ইতিহাসবিদদের মতে চতুর্থ-পঞ্চম শতকে বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশের সাক্ষ্য বহন করে।

প্রকৃতি ও মানুষের জীবন

ফেনীর জীবন-সংস্কৃতি প্রবলভাবে প্রকৃতি নির্ভর। নদীভাঙন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ এখানে সাধারণ ঘটনা। এসব মোকাবিলা করতে করতে স্থানীয় মানুষ সৃষ্টি করেছে এক সংগ্রামী পরিচয়। কৃষি, মৎস্য এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা।

ঐতিহ্য ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা

ফেনী শুধু ইতিহাসে নয়, প্রতিরোধের গৌরবেও সমৃদ্ধ। অষ্টাদশ শতকে এখানে শমশের গাজী তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন এবং ত্রিপুরা-রৌশনাবাদ জয় করে এক অনন্য নেতৃত্বের স্বাক্ষর রাখেন। জনশ্রুতি আছে, চম্পকনগরে তিনি ‘জগন্নাথ সোনাপুর’ নামকরণও করেন।

ইউরোপীয় শাসনামলে নোয়াখালীর বিভাজনের ফলে ফেনী প্রশাসনিক গুরুত্বে এগিয়ে আসে। নবীনচন্দ্র সেন মহকুমা প্রশাসক হিসেবে ফেনী নগরায়ণে অনন্য ভূমিকা রাখেন।

বর্তমানে ফেনী একটি দ্রুত বর্ধনশীল জেলা—শিল্প, শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা ও যোগাযোগে সমানভাবে আধুনিকায়নের ছাপ দেখা যায়। বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষুদ্র জেলা হলেও ফেনী তার ঐতিহ্য, প্রকৃতি, সংগ্রামী মানুষ ও ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে নিজস্ব পরিচয়ে আলোকিত।

সূত্র : ফেনীতে ভাষা আন্দোলন

লেখক : ফিরোজ আলম

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window