জ্ঞান অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে বই। কিন্তু পৃথিবীতে প্রকাশিত অসংখ্য বইয়ের ভিড়ে কোনটি আপনার জন্য উপযুক্ত—এটাই বড় প্রশ্ন। বাজারে যত বই আছে, সব পড়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আবার এলোমেলোভাবে বই পড়তে গিয়ে অনেক সময় মনোযোগ ছড়িয়ে যায়। ফলে পাঠের আনন্দ হারিয়ে যায় এবং পাঠের মূল উদ্দেশ্যও পূরণ হয় না। পাঠকে ফলপ্রসূ করতে হলে প্রয়োজন সঠিক বই বেছে নেওয়া। এই বোধ থেকেই জনপ্রিয় লেখক ও সামাজিক কর্মী জাহাঙ্গীর আলম শোভন লিখেছেন সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত কার্যকর বই “বই নির্বাচন”।

২০২৩ সালে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে প্রকাশিত এই ৩২ পৃষ্ঠার ছোট বইটি মূলত ছাত্রছাত্রী, তরুণ পাঠক এবং বই–প্রেমিদের জন্য একটি ব্যবহারিক গাইডলাইন হিসেবে রচিত। লেখক তাঁর দীর্ঘদিনের পাঠ–অভিজ্ঞতা এবং পাঠকদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তুলে ধরেছেন—কীভাবে একজন পাঠক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী আদর্শ বই বেছে নিতে পারবেন।

অনেকেই মনে করেন, যেকোনো বই পড়লেই জ্ঞান বাড়ে। বাস্তবে কিন্তু তা নয়। পড়ার উদ্দেশ্য স্পষ্ট না হলে পাঠ আনন্দদায়ক হয় না, আবার প্রকৃত জ্ঞান অর্জনও কঠিন হয়ে পড়ে। লেখকের মতে, প্রতিটি পাঠকের আগ্রহ, লক্ষ্য এবং প্রয়োজন ভিন্ন। তাই সবার বই এক হওয়া সম্ভব নয়। কারো প্রয়োজন হতে পারে ক্যারিয়ার উন্নয়নমূলক বই, কারো প্রয়োজন আত্মোন্নয়ন, কারো আগ্রহ উপন্যাস, ভ্রমণ অথবা জ্ঞানমূলক বইয়ে। কাজেই প্রথম ধাপই হলো—নিজের প্রয়োজন চিহ্নিত করা। বইটি পাঠককে শেখায় কীভাবে নিজের আগ্রহ ও প্রয়োজন বিশ্লেষণ করে সঠিক বই বেছে নেওয়া যায়।

বইমেলা, বুকস্টল বা অনলাইন—সবখানেই বর্তমানে বইয়ের বিশাল সমাহার। এই বিপুল ভিড়ে মানসম্মত বই খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বইটিতে বলা হয়েছে, বই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু সূচক বিবেচনা করা জরুরি—

  • লেখকের পরিচিতি ও পূর্ববর্তী কাজ

  • প্রকাশনীর মান

  • বইয়ের ভাষা, কাঠামো ও উপস্থাপনা

  • পাঠকের রিভিউ

  • নিজের পাঠ–উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিল

এভাবে সচেতনভাবে বাছাই করলে অপ্রয়োজনীয় বা অনভিপ্রেত বই পড়ার ঝুঁকি কমে যায়। একটি ভালো বই পাঠককে শুধু আনন্দই নয়, নতুন চিন্তা ও উপলব্ধিও উপহার দেয়।

বই শুধু নিজের পড়ার জন্য নয়, উপহার হিসেবেও দুর্দান্ত একটি মাধ্যম। তবে উপহার হিসেবে বই কিনতে গেলে প্রাপকের রুচি বুঝতে হয়। লেখকের মতে, বয়স, পেশা, আগ্রহ এবং পড়ার অভ্যাস বিবেচনা করে বই নির্বাচন করতে হবে। শিশুদের বই বড়দের মতো হতে পারে না, আবার গবেষণামূলক বই সব পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। এ বইতে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা আছে—কীভাবে আপনি যার জন্য বই কিনছেন, তার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উপযুক্ত বই নির্বাচন করবেন।

ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক লাইব্রেরির জন্য বই অন্তর্ভুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোন বইগুলোর চাহিদা বেশি, কোন বই পাঠকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারযোগ্য, কোন বই জ্ঞানসমৃদ্ধ—এসব বিবেচনা করে সংগ্রহ গঠন করতে হয়। “বই নির্বাচন” বইটি লাইব্রেরির জন্য বই কেনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য পরামর্শ প্রদান করে, যা নিঃসন্দেহে লাইব্রেরিয়ান বা পরিচালকদের জন্য সহায়ক।

অনেকেই অভিযোগ করেন—সময় নেই, তাই বই পড়া হয় না। লেখক এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে চান। তিনি জানান, সময়ের অভাব নয়, প্রয়োজনীয় বই নির্বাচনের অভাবই অনেক সময় পাঠে অনীহা তৈরি করে। যদি পাঠক জানেন কোন বই তাঁকে সবচেয়ে বেশি উপকার দেবে, তবে অল্প সময়ে সেই বই পড়ে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। বইটি শিখিয়ে দেয়—পড়ার জন্য সময় নয়, বরং বাছাই–ক্ষমতা জরুরি।

যেহেতু বইটি ছাত্রজীবন উন্নয়ন নিয়ে রচিত, তাই এখানে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে—ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে পাঠ–অভ্যাস গড়ে তুলবেন এবং কোন ধরনের বই তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার, ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাশক্তি বিকাশে সহায়ক হতে পারে। ছাত্রজীবনে সঠিক বই পড়া মানেই নিজের ভবিষ্যৎকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। লেখক এই বইকে একটি দিকনির্দেশক মানচিত্রের মতো ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছেন, যাতে নতুন পাঠক ভুল পথে না যান।

৩২ পৃষ্ঠার ছোট এই বইটি সত্যিকারের একটি ‘পকেট গাইড’। সহজ ভাষা, সুসংগঠিত উপস্থাপন এবং বাস্তবমুখী পরামর্শ—সব মিলিয়ে এটি নতুন ও পুরনো সব পাঠকের জন্যই সমান কার্যকর।

লেখা প্রস্তুতে ব্যবহৃত তথ্যঃ

  • লেখক: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

  • প্রকাশনী: ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ

  • বই: বই নির্বাচন (১ম প্রকাশ, ২০২৩)

  • বিষয়বস্তু: ছাত্রজীবন উন্নয়ন ও পাঠ–নির্বাচন নির্দেশিকা

সূত্র: www.wafilife.com

প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window