বিবি আমতুস সালাম:  পাঞ্জাব থেকে নোয়াখালী

দক্ষিণ এশিয়ার উপমহাদেশ যখন বিশ শতকের প্রথমার্ধে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঔপনিবেশিক শোষণ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দুঃসহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন কিছু মানুষ নীরবে মানবিকতা, শান্তি ও নৈতিকতার পথ অনুসরণ করে সমাজের মধ্যে আলো জ্বালিয়ে গেছেন। এই অনালোচিত, কিন্তু গভীরভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন হলেন বিবি আমতুস সালাম, যিনি ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠজন, ‘কন্যাসমা’ শিষ্যা, স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী, এবং ভারত ও বাংলাদেশের দাঙ্গাপীড়িত মানুষের অন্যতম ত্রাণদাতা।

তাঁর নাম বৃহত্তর ইতিহাসে তেমন উচ্চারিত হয় না, কিন্তু তাঁর কার্যক্রম, আত্মত্যাগ এবং নৈতিক শক্তি ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে শান্তি প্রতিষ্ঠার এক অনন্য অধ্যায় সৃষ্টি করেছে।

 জন্ম, পরিচয় ও শৈশব

বিবি আমতুস সালাম ১৯০৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের পাতিয়ালা অঞ্চলে এক মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল রক্ষণশীল, কিন্তু সামাজিকভাবে সম্মানিত। বাবা আবদুল মজিদ খান ছিলেন কঠোর নীতিবদ্ধ ও প্রভাবশালী লোক।

তৎকালীন সমাজে মুসলিম নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষা বা সামাজিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা এবং কর্মস্পৃহা তাঁকে দ্রুত অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।

ধর্মীয় নীতি, সততা, দয়া এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ছিল তাঁর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য—যা পরবর্তী জীবনে তাঁর কর্ম ও সাহসের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

 গান্ধীর সঙ্গে পরিচয় ও আদর্শিক রূপান্তর

তরুণী বয়সেই তিনি মহাত্মা গান্ধীর নন-হিংসা, সত্যাগ্রহ এবং সামাজিক সম্প্রীতির দর্শনে আকৃষ্ট হন। পরে তিনি গান্ধীর সেভাগ্রাম আশ্রমে যোগ দেন। সেখানে তাঁর আচরণ, সেবা এবং নৈতিক দৃঢ়তা গান্ধী ও কস্তুরবা গান্ধীর গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করে।

গান্ধী তাঁকে নিজের “মেয়ে” হিসেবে উল্লেখ করতেন। তাঁর কাছে বিবি আমতুস সালাম শুধু একজন আশ্রমকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন আস্থাভাজন, আধ্যাত্মিক সাথী, এবং কঠিন সময়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহযাত্রী।

তিনি ছিলেন এমন কয়েকজন মুসলিম নারীর একজন যাঁরা প্রকাশ্যে গান্ধীবাদ গ্রহণ করেছিলেন।

 নোয়াখালীর দাঙ্গা ও শান্তি মিশন

১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে গান্ধী সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি সেখানে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করবেন। গান্ধীর সঙ্গে যে ক’জন ঘনিষ্ঠজন সেই দুঃসাহসী অভিযানে ছিলেন, তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিলেন বিবি আমতুস সালাম। তিনি নির্যাতিত নারী, বৃদ্ধ ও দুঃস্থদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। দাঙ্গাগ্রস্ত গ্রামগুলোতে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন। গান্ধীর সঙ্গে পায়ে হাঁটা শান্তি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। নোয়াখালীর মানুষের সঙ্গে আস্থা পুনঃস্থাপনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ২১ দিন উপবাস পালন করেন। এটি ছিল নোয়াখালী আন্দোলনের সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনাগুলির একটি। এই উপবাস শুধু আত্মশুদ্ধি নয়—বরং সম্প্রদায়ভিত্তিক বিশ্বাসঘাটতির বিরুদ্ধে তাঁর নৈতিক প্রতিবাদ। গান্ধী লিখেছিলেন: “নোয়াখালীর শান্তির মূল শক্তি আমতুস সালাম।”

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক হিংসা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে গেলে বিবি আমতুস সালাম তাঁর নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে উভয় সম্প্রদায়ের নারীদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনে কাজ করেন।

তিনি— নারী অপহরণ, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার মানুষদের উদ্ধার করেন। ভারত-পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়া মানুষের পুনর্বাসনে ভূমিকা রাখেন। উভয় ধর্মের মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সেবা প্রদান করেন। তাঁর এই কাজগুলো রাজনৈতিক নয়—শতভাগ মানবিক।

বিভক্তির পরে তিনি পাঞ্জাবের রাজপুরায় কস্তুরবা সেবা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে— বহাওয়ালপুর থেকে আসা উদ্বাস্তু হিন্দু পরিবারদের পুনর্বাসন, নারীর স্বাবলম্বিতা ও কর্মসংস্থান, শিশুদের শিক্ষা, সামাজিক পুনর্গঠন, ইত্যাদির ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি রাজপুরাকে শান্তি ও পুনর্গঠনের একটি প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায়, তিনটি পবিত্র খড়্গ (swords) নিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিলে তিনি ২৬ দিনের অনশন করেন। তাঁর অনশন ছিল: যা ছিল সত্যাগ্রহের এক শক্তিশালী উদাহরণ ও সাম্প্রদায়িক বিরোধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তিনি সমঝোতার পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা করেন। অনশন চলাকালে তাঁর শরীর ভেঙে পড়লেও তিনি হাল ছাড়েননি। পরে নেতৃবৃন্দ বাধ্য হয় পরিস্থিতি সমাধান করতে।

১৯৮০-এর দশকে তিনি ভারতের All India Committee on Jail Reforms এর সদস্য ছিলেন, যেখানে তিনি কারাগারব্যবস্থা, বন্দিদের অধিকার এবং পুনর্বাসন বিষয়ে অবদান রাখেন।

তাঁর জীবন জুড়ে তিনি প্রচারবিমুখ ছিলেন; কখনো নিজের নাম প্রচারে আনেননি। অথচ তাঁর কাজ সমাজকে নীরবে পরিবর্তন করেছে।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

বিবি আমতুস সালাম ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ বড় মিডিয়ায় তেমন আলোচিত না হলেও ইতিহাসবিদরা পরবর্তীতে তাঁর কর্মের গুরুত্ব বড় করে মূল্যায়ন করতে শুরু করেন।

আজ তিনি— সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক, উপমহাদেশের শান্তি আন্দোলনের এক অগ্রদূত, নারীর মানবিক শক্তির জ্বলন্ত উদাহরণ। বাংলাদেশের নোয়াখালী এবং ভারতের পাঞ্জাব—উভয় ভূখণ্ডেই তাঁর স্মৃতির রেখা অমলিন।

সূত্রসমূহ 

১. Wikipedia – Bibi Amtus Salam
https://en.wikipedia.org/wiki/Bibi_Amtus_Salam

২. New Age Islam (Afroz Khan)“Bibi Amtus Salam: The Unsung Hero of India’s Partition”
https://www.newageislam.com/islam-women-feminism/afroz-khan-new-age-islam/bibi-amtus-salam-unsung-hero-india-s-partition/d/136223

৩. StoryMirror (Bengali)“বিবি আমাতুস সালাম”
https://storymirror.com/read/bengali/story/bibi-aamaatus-saalaam/uizsk2al

৪. History369 Blog“Bibi Amatus Salam”
https://history369.blogspot.com/2017/12/bibi-amatus-salam.html

৫. Dr. Chaman Singh – WordPress“Ek Thi Bibi Amtus Salam”
https://drchaman.wordpress.com/2009/07/03/eik-thi-bibi-amtus-salam

৬. All Indians Matter“Heroism and compassion amid Partition”
https://www.allindiansmatter.in/heroism-and-compassion-amid-the-horrors-of-partition-part-2

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window