বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে যে সব নাম সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাদের মধ্যে বিমল কর অন্যতম। তিনি শুধু একজন দক্ষ সেন্টার-ব্যাকই নন, বরং মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য হিসেবে দেশের মুক্তির সংগ্রামে ক্রীড়ার মাধ্যমে অনন্য ভূমিকা রাখেন। মাঠে তাঁর শক্ত রক্ষণভাগ, নেতৃত্বগুণ ও অনমনীয় মনোভাব যেমন তাঁকে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকালীন ফুটবল দলের সদস্য হিসেবে তিনি ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম গভীরভাবে লিখে গেছেন।

বিমল কর ১৯৩৭ সালের ৯ জুন ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার এক শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা রোহিনি কর এবং মা হীরণময়ী কর। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তাঁর নেশা ও ভালোবাসা। ফেনী হাই স্কুলে পড়াশোনা করার সময় তিনি স্কুল ফুটবল দলে নিয়মিত খেলতেন। পাশাপাশি স্থানীয় ফেনী এভারগ্রীন ক্লাবের হয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে নিজের প্রতিভা তুলে ধরেন।

পরবর্তী সময়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময়ও তিনি ফুটবলে দারুণ সক্রিয় ছিলেন। কলেজ জীবনেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে তিনি স্থানীয় ফুটবল অঙ্গনে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর খেলার ধরন ছিল সুশৃঙ্খল, কঠোর এবং দৃঢ়—যা সেন্টার-ব্যাক পজিশনের জন্য প্রয়োজনীয় সব গুণই ধারণ করত।

১৯৫৯ সালে বিমল কর চাকরি নেন চট্টগ্রাম রেলওয়েতে। একই বছরে তিনি রেলওয়ের ফুটবল দলে যোগ দেন এবং চট্টগ্রাম ফুটবল লিগে নিয়মিত খেলতে শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর দক্ষতা দেখে চট্টগ্রাম কাস্টমস ও চট্টগ্রাম পাওয়ার বোর্ড প্রথম বিভাগ দলে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে চট্টগ্রাম ফুটবলে এক নির্ভরযোগ্য রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ে পরিণত করে।

১৯৬৬ সালে তিনি যোগ দেন ঢাকার ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে, যা সে সময়ের ঢাকা প্রথম বিভাগ লিগের অন্যতম নামকরা দল ছিল। ঢাকার প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে তাঁর দৃঢ় উপস্থিতি তাঁকে দেশের বিভিন্ন ক্লাবের কাছে পরিচিত ও সম্মানিত করে তোলে।

১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম মোহামেডানের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে দলটি পরপর দুই বছর চট্টগ্রাম প্রথম বিভাগ চ্যাম্পিয়ন হয়—যা তাঁর নেতৃত্ব এবং খেলোয়াড়ত্ব উভয়েরই উজ্জ্বল প্রমাণ। দীর্ঘ ক্লাব ক্যারিয়ারের পর ১৯৭৬ সালে তিনি চট্টগ্রামের ইয়াং স্টার ক্লাবের হয়ে খেলে অবসর নেন।

১৯৭১ সালে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধ বিমল করের জীবন ও ক্যারিয়ারে এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করে। যুদ্ধের উত্তাল সময়ে তিনি ভারতের আগরতলায় আশ্রয় নেন। সেখানে ‘ফ্রেন্ডস ক্লাব’-এর হয়ে আগরতলা ফুটবল লিগে খেলতে শুরু করেন। তাঁর পারফরম্যান্স নজর কাড়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গঠনে যুক্ত ব্যক্তিদের।

২৫ জুলাই ১৯৭১ সালে নাদিয়া একাদশের বিপক্ষে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম ম্যাচে তিনি বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন, যেখানে তিনি শেখ মনসুর আলীর স্থলাভিষিক্ত হন। এরপর তিনি হয়ে ওঠেন দলের নিয়মিত সেন্টার-ব্যাক। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ১৬টি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল, যার লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং জনমত তৈরি। এই অভিযানে বিমল কর ছিলেন দলের অন্যতম ভরসা।

তার রক্ষণভাগের দৃঢ়তা দলটিকে বহু ম্যাচে এগিয়ে রাখে এবং তাঁর খেলোয়াড়সুলভ দায়িত্ববোধ দলটির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি শুধু খেলেননি, তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে দেশের স্বাধীনতার জন্য ক্রীড়াঙ্গনও হতে পারে এক শক্তিশালী সংগ্রামমঞ্চ।

স্বাধীনতার পর ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত হয় নতুন বাংলাদেশের প্রথম ফুটবল ম্যাচ—বাংলাদেশ একাদশ বনাম প্রেসিডেন্ট একাদশ। এই ঐতিহাসিক ম্যাচে তিনি স্বাধিন বাংলা দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে বাংলাদেশ একাদশ হয়ে খেলেন। যদিও ম্যাচটি ২–০ ব্যবধানে হার দিয়ে শেষ হয়, তবুও দেশের ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচ ছিল নতুন অধ্যায়ের সূচনা, এবং বিমল কর ছিলেন তার অংশ।

১৯৭৬ সালে ফুটবল থেকে অবসর নিলেও ফুটবলকে তিনি কখনো জীবনের বাইরে রাখেননি। তিনি চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অধীনে প্রথম শ্রেণির রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতা তাঁকে একজন সম্মানিত ক্রীড়া সংগঠকে পরিণত করে এবং তিনি দীর্ঘসময় চট্টগ্রাম মোহামেডানের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন।

বিমল কর ছিলেন পরিবারের প্রতি নিবেদিত একজন মানুষ। তাঁর স্ত্রী, তিন কন্যা ও এক পুত্র ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। জীবনের শেষদিকে বয়সজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে ঢাকা সেন্ট্রাল মিলিটারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।

বিমল কর শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক সংগ্রামী ক্রীড়নক, এক দেশপ্রেমিক, এবং এক মানবিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলা ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ও অবদান বাংলাদেশের ফুটবল এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Source : wikipedia

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window