আলী নেওয়াজ (জন্ম: ১১ মার্চ ১৯২৮, মৃত্যু: ১৯৯৮) ছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মানিত বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি তাঁর সাহস, দুঃসাহস ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশের মুক্তির সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
আলী নেওয়াজের জন্ম ফেনী জেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন ফেলু মিয়া, আর মাতার নাম নূর খাতুন। তিনি পরবর্তীতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন; তাঁর স্ত্রী সাহেদা বেগম ও তাঁদের এক ছেলে ও তিন মেয়ে ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে আলী নেওয়াজ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করেছিলেন। ১৯৭১ সালের দিকে, রেজিমেন্টটি সৈয়দপুর সেনানিবাসে ছিল। কিন্তু যখন পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তখনই আলী নেওয়াজ দেশনায়ক হিসেবে গড়ি গড়ে তোলেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছেড়ে দিয়ে স্বাধীনতার পক্ষ দিকটি বেছে নেন। songramernotebook.com+1
স্বাধীনতার ডাক পেয়ে আলী নেওয়াজ দেশত্যাগ করেন এবং ভারতে গিয়ে গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর ১৯৭১ সালের সংঘর্ষময় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধের সময় তিনি বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন সিলেট এলাকার ছাতক, গোয়াইনঘাট, রাধানগর, সালুটিকর, গোবিন্দগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলে।
গোয়াইনঘাটে এক অভিযানে — ২ বা ৩ ডিসেম্বর ভোর থেকেই — তিনি ও তাঁর সংগীর দল পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে কৌশলগত হামলা শুরু করেন। তারা ধোঁকা দিয়ে সুরমা নদী অতিক্রম করে ঘাট এলাকা থেকে পশ্চিম দিক থেকে হামলা চালায়। গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং গেরিলাযুদ্ধের কলাকৌশল প্রয়োগ করে পাক-সেনাদের চরম বিপর্যয়ে ফেলে। এভাবে গোয়াইনঘাট দ্রুত হলেও মুক্ত হয়। এই ঘটনার রণকৌশল ও সাহসিকতা ছিল অভূতপূর্ব। songramernotebook.com
তদুপরি, জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী রাজাকার ও সশস্ত্র বিহারি বিরুদ্ধেও আলী নেওয়াজ ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নায়ক। ওই স্থানে ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধারা এক সামগ্রিক পরিকল্পনায় আক্রমণ চালান। চিনিকল, রেলওয়ে ওয়ার্কশপ, রেলস্টেশন, পাওয়ার হাউস, থানাসহ একাধিক স্থানে তারা একযোগে হামলা চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের আকস্মিক হামলায় রাজাকার ও সশস্ত্র বিহারি দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয় — তাদের একটি দল আত্মসমর্পণ করেছিল। যুদ্ধ ও আক্রমণের মধ্য দিয়ে দেওয়ানগঞ্জ এলাকা পাকিস্তানি বিরোধী মুক্তিস্থানে পরিণত হয়। আলী নেওয়াজ ও তাঁর সহযোদ্ধাদের সাহসিকতা ও সংগঠিত পরিকল্পনা এই সাফল্যে বিশেষ ভূমিকা রাখে। songramernotebook.com
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য, ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩ তারিখে বীর প্রতীক খেতাবে আলী নেওয়াজকে ভূষিত করা হয়। উক্ত খেতাব বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড; দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় সাহসিক ও ত্যাগপূর্ণ ভূমিকার জন্য এটি প্রদান করা হয়। Wikipedia+2molwa.portal.gov.bd+2
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ দিন তিনি সাধারণভাবে জীবনযাপন করেন। ১৯৯৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন আলী নেওয়াজ। তাঁরুণ দেখিয়ে গেছেন — একজন সাধারণ মানুষও যদি সঠিক চেতনা, দৃঢ় সংকল্প ও সাহসিকতা নিয়ে দেশের জন্য স্বীকৃত দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে তার অবদান কখনো হারিয়ে যায় না। songramernotebook.com+1
আলী নেওয়াজের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা — যারা গেরিলা যুদ্ধ, পার্থিব জীবন ত্যাগ ও স্পষ্ট রণকৌশলের মাধ্যমে মুক্তির সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন — তাঁদের অবদানের গুরুত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসে অম্লান। বীর প্রতীক খেতাবের মতো পুরস্কার এই বীরজন্মাদের সম্মানের মাত্রা বাড়িয়েছে।
তাঁর জীবনী ও বীরত্ব নতুন প্রজন্মকে দেশের জন্য আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের মূল্য স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।
Last modified: ডিসেম্বর ২, ২০২৫