বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা রাখা সাহসী সন্তানের নাম ভুলু মিয়া। বীরত্ব, নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমের জন্য তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাবগুলোর একটি বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর সংগ্রামী জীবন, যুদ্ধক্ষেত্রের অসামান্য অবদান ও দেশমাতৃকার প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে আসছে।
জন্ম ও পারিবারিক জীবন
ভুলু মিয়ার জন্ম ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া উপজেলার ঢেউলিয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম বসু মিয়া এবং মায়ের নাম সরবতেন নেছা। স্ত্রী আরজাহান বেগমের সঙ্গে তাঁর তিন ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে উঠলেও দেশপ্রেম, মানবতা ও ন্যায়ের প্রতি দৃঢ়তা তাঁর ব্যক্তিত্বকে বিশেষভাবে আলাদা করে তোলে।
শিক্ষা ও কর্মজীবন
ইপিআরে চাকরি জীবন শুরু করেন ভুলু মিয়া। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দিনাজপুর ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হামলার মুহূর্তে তিনি অসাধারণ নেতৃত্ব দেখান। তাঁর দিকনির্দেশনায় বাঙালি ইপিআর সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন। ভারতে অবস্থানকালে তিনি নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত হন।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের গল্প
১৯৭১ সালের ৩১ জুলাই বাহাদুরাবাদ ঘাটে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে ভুলু মিয়া অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দেন। ভোরের আগেই তিনি তাঁর দল নিয়ে রেলঘাটের জংশন পয়েন্টে অবস্থান নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েকটি দল একযোগে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আক্রমণ চালায়।
ভুলু মিয়ার নেতৃত্বে সহযোদ্ধারা রেলবগিতে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর রকেট লঞ্চার ও হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে পাঁচটি রেলবগি ধ্বংস হয় এবং শত্রুপক্ষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অপারেশনের পুরো সময় তিনি সম্মুখসারিতে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেন এবং অভিযানের সফলতা নিশ্চিত করেন।
পরবর্তীতে বৃহত্তর সিলেটের গোয়াইনঘাট, ছাতক, রাধানগরসহ একাধিক স্থানে তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ পরিচালনা করেন। দেশের জন্য তাঁর আত্মত্যাগ ও অবদান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় স্থান করে নিয়েছে।
সম্মাননা
দেশের স্বাধীনতার জন্য অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ভুলু মিয়াকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। এটি তাঁর বীরত্ব, নেতৃত্ব ও জাতীয় দায়িত্ববোধের এক অনন্য স্বীকৃতি।
পাঠচক্রে জীবনগাঁথার আলোচনার আয়োজন
২০২৪ সালের ১৮ মে ফেনী বন্ধুসভা বীর মুক্তিযোদ্ধা ভুলু মিয়ার জীবনী নিয়ে পাঠচক্রের আয়োজন করে। প্রথম আলোর ফেনী অফিসে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে তাঁর জীবন, সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধে অবদান নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন সংগঠনের উপদেষ্টা, কর্মকর্তাবৃন্দ ও সদস্যরা। পাঠাগার সম্পাদক রেজাউল করিম বইটির সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন এবং পরে অন্য সদস্যরা আলোচনা সমৃদ্ধ করেন। প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানোর একটি সুন্দর উদ্যোগ হিসেবে এই পাঠচক্র গভীর প্রশংসা অর্জন করে।
তথ্যসূত্র : wikipedia
Last modified: এপ্রিল ১৩, ২০২৬