মো. ছানাউল্লাহ ১৯৪০ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার গঙ্গাপুর গ্রামের একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন মো. সোলায়মান এবং মাতা সাদিয়া খাতুন। ছোট বেলা থেকেই তিনি দৃঢ় চরিত্র এবং দেশপ্রেমে পরিপূর্ণ ছিলেন, যা পরবর্তীতে তার জীবনের অন্যতম মূল অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
স্কুল ও প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি যুবো বয়সেই দেশের সাধারণ মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে জীবনযাপন করেন। ১৯৭১ সালের পূর্বপ্রসঙ্গেই তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে গুরুতর উদ্বিগ্ন ছিলেন, যা তাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করে। (এখানে উৎস হিসেবে স্থানীয় স্মৃতিচারণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার উল্লেখযোগ্য, যদিও প্রামাণ্য তালিকায় নয়)
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি বাহিনী খুলনা থেকে শুরু করে সারা দেশে প্রতিটি এলাকায় বাঙালি জনগণের উপর নির্মম অত্যাচার শুরু করলে মো. ছানাউল্লাহ তৎক্ষণাৎ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি মূলত মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনীর একজন সাহসী সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
তার দায়িত্ব ছিল সাধারণ গেরিলা স্টাইলে সক্রিয়ভাবে:
-
শত্রুর যোগাযোগ ব্যাহত করা
-
সরবরাহ লাইন ও যানজট ধ্বংস করা
-
পাকিস্তানি বাহিনীর গোপনস্থল ও সামরিক চৌকিতে আক্রমণ চালানো
এই কর্মকাণ্ডগুলো মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পিত প্রাথমিক গেরিলা অপারেশন অংশ হিসেবে ছিল, যেখানে ছোট দলগুলো শক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনীর ভেতরেই ঢুকে তাদের সামরিক কার্যক্রমকে বিঘ্নিত করত। (যেমন সেক্টর ভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম সাধারণত ছিল)
গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণের সময় তিনি স্থানীয় জনগণের সাথে মিলিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর নজর এড়াতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতেন এবং রাতে আক্রমণ, দিনে গোপনে সংযোগ রক্ষা করতেন — যা ছিল তখনকার গেরিলা যুদ্ধ কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এ ধরনের কৌশল মুক্তিযুদ্ধ পুরষ্কারপ্রাপ্ত বহু গেরিলা যোদ্ধার সাধারণ পদ্ধতির অংশ ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তার অসাধারণ সাহস, নিঃস্বার্থ অবদান এবং স্বদেশ প্রেমের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাব প্রদান করে। বীর বিক্রম হলো বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ বীরত্ব খেতাব, যা শুধুমাত্র যাদের অসাধারণ সাহস ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয় — মোট কেবল ১৭৫ জনকে এই সম্মান প্রদান করা হয়েছে।
এই খেতাবটি ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে বীর যোদ্ধাদের অবিস্মরণীয় করে রাখে।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের তীব্রতম সময়গুলোতে মো. ছানাউল্লাহ সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতেন। একাধিক গেরিলা অভিযান শেষে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের সাথে সংঘর্ষে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। আহত অবস্থায় তাঁকে সৈনিক ও স্থানীয় মানুষের সহায়তায় তৎক্ষণাৎ কোন নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তার অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল।
শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের মারাত্মক লড়াইয়ের মাঝেই তিনি শহীদ হন, তার এই অনবদ্য ত্যাগ ও সাহস বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। (শহীদ হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ রেকর্ডে পাওয়া যায়নি; তবে অন্যান্য মর্মান্তিক বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মতো তিনি একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন)।
শহীদ মো. ছানাউল্লাহর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে স্থানীয় মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনগুলো বিভিন্ন স্মৃতি অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকেন এবং মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংরক্ষণ কার্যক্রমে তার নাম উচ্চারণ করা হয়।
মো. ছানাউল্লাহ স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন — যা বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এক অনন্য প্রেরণা। আজও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনায় তাঁর নাম উচ্চারিত হয়, এবং ইতিহাস গবেষণা, জনসাধারণের স্মৃতি ও সাহিত্যিক চর্চায় তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বিবেচিত হয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে তাঁদের মুক্তিযুদ্ধ কাহিনি সংরক্ষণের পদক্ষেপ পরিচালিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস উপলব্ধ করতে পারে — এই প্রক্রিয়ার আওতায় ওই সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
বীর বিক্রম মো. ছানাউল্লাহ ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করা এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে উত্তরসঞ্চারিত হয়ে তিনি স্বাধীনতার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন এবং নিজের প্রাণ বাজি রেখে দেশের জন্য এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সাহসিকতা ও ত্যাগ আজো বাংলাদেশের হৃদয়ে বেঁচে আছে এবং স্বাধীনতা‑স্মৃতিকে শক্তি যোগায়।
সুত্র : Press Inform
প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।
Last modified: ডিসেম্বর ১১, ২০২৫