বীর বিক্রম শহীদ এয়ার আহমদ বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা প্রদর্শনকারী এক গর্বিত যোদ্ধা। তাঁর জন্ম ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের বালুয়া গ্রামে। বাবা নজির আহম্মদ ও মা রোকেয়া বেগমের পাঁচ ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই তিনি দায়িত্বশীল ও আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর বীরত্বের ভিত্তি তৈরি করে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন এয়ার আহমদ। ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে বাবা–মা তাঁর জন্য পাশের গ্রামের এক মেয়ের সঙ্গে বিয়ের কথা ঠিক করেন। এ খবর জানিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হলে তিনি ছুটি নিয়ে বাড়ি আসেন। ঠিক সেই সময়ই শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন, আর অল্প কিছুদিন পরেই শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি আর ব্যক্তিজীবনের দিকে ফিরে তাকাননি—যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ফেনী জেলার বিলোনিয়া অঞ্চল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিলোনিয়া থেকে ফেনী পর্যন্ত রেললাইন এবং সমান্তরালে একটি কাঁচা রাস্তা শত্রু বাহিনীর চলাচলের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অক্টোবর মাসের শেষ দিক থেকে টানা বৃষ্টির মাঝেই মুক্তিযোদ্ধারা চিথলিয়া-পরশুরামের মধ্যবর্তী এলাকায় রেললাইনের পাশে অবস্থান নেন পাকিস্তানি সেনাদের টহল দলকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে।
ভোরের আলো ফুটতেই তারা দেখতে পান একটি রেলট্রলি এগিয়ে আসছে। ট্রলিতে ছিল কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ও একজন অফিসার। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এয়ার আহমদ ছিলেন সবচেয়ে সাহসী ও অভিজ্ঞ। আওতার মধ্যে আসতে না আসতেই তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র গর্জে ওঠে। প্রথম গুলিও ছোড়েন তিনি। মুহূর্তেই আক্রমণ সফল হয়।
এরপর সাহসের উৎসাহে তিনি দৌড়ে যান পড়ে থাকা এক পাকিস্তানি সেনা অফিসারের দিকে এবং অফিসারের কোমরে বাঁধা খাপ থেকে পিস্তল সংগ্রহ করেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি শহীদ হন। সহযোদ্ধারা গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে সমাহিত করেন দক্ষিণ পৈথারা গ্রামে—যা তাঁর নিজ গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ২ নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টরের পরশুরাম, মুন্সিরহাট, ফুলগাজী, সালধরসহ বিভিন্ন স্থানে অসাধারণ বীরত্ব দেখান। তাঁর অধিনায়ক ছিলেন ইমাম-উজ-জামান (বীর বিক্রম)। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সাহস, দৃঢ়তা ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল উদাহরণ।
তাঁর অমর বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে বীর বিক্রম খেতাব। তাঁর খেতাবের সনদ নম্বর—৩৬। ১৯৭১ সালের ৯ নভেম্বর তিনি শহীদ হন। দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা এই মহৎ সন্তান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
সূত্র
-
একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২
-
প্রথম আলো, প্রকাশিত ২৩ মে ২০২১
Last modified: ডিসেম্বর ১, ২০২৫