ভুলুয়া থেকে নোয়াখালীর ইতিহাস

নোয়াখালীর প্রাচীন নাম ছিল ভুলুয়া। জেলার সদর থানার আদি নাম সুধারাম। ইতিহাসবিদদের মতে, একবার ত্রিপুরার পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীর পানিতে ভুলুয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয় এবং ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করা হয়। খালটি ডাকাতিয়া নদী থেকে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ি ও চৌমুহনী হয়ে মেঘনা এবং ফেনী নদীর দিকে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করত। স্থানীয়ভাবে এই নতুন খালকে ‘নোয়া খাল’ বলা হতো, যা ধীরে ধীরে ‘নোয়াখালী’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

বর্তমান নোয়াখালী জেলা ফেনী, লক্ষ্মীপুর এবং নোয়াখালীকে নিয়ে গঠিত বৃহত্তর নোয়াখালীর অংশ। ১৭৭২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এদেশে প্রথম আধুনিক জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা করেন। সমগ্র বাংলাদেশকে ১৯টি জেলায় বিভক্ত করে প্রতিটি জেলায় কালেক্টর নিয়োগ করা হয়। এদের মধ্যে একটি জেলা ছিল কলিন্দা, যা মূলত নোয়াখালী অঞ্চলকে নিয়ে গঠিত। ১৭৭৩ সালে জেলা প্রথা প্রত্যাহার করা হলেও, ১৭৮৭ সালে পুনরায় জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা চালু হয় এবং সমগ্র বাংলাদেশকে ১৪টি জেলায় ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ভুলুয়া নামে একটি জেলা ছিল। ১৭৯২ সালে ত্রিপুরা নামে নতুন জেলা গঠিত হলে ভুলুয়া তাতে অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই সময়ে শাহবাজপুর, হাতিয়া, নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ড, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, ত্রিপুরার কিছু অংশ, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও মীরসরাই মিলিয়ে ভুলুয়া পরগনা গঠিত হয়। ১৮২১ সালে ভুলুয়া স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আগে এটি ত্রিপুরা জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অবশেষে ১৮৬৮ সালে ভুলুয়া জেলা নাম পরিবর্তন করে নোয়াখালী নামে পরিচিতি পায়।

নোয়াখালী জেলা শহরের নাম মাইজদী। ১৯৪৮ সালে উপজেলা সদর দপ্তর মেঘনা নদীর প্রবাহে বিলীন হওয়ায় ৮ কিলোমিটার উত্তরে স্থানান্তর করা হয় এবং ১৯৫০ সালে অস্থায়ীভাবে মাইজদীকে জেলা সদরদপ্তর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ব্রিটিশ শাসনের সময় শহরের পুনর্গঠন করা হয়। পুরনো শহরের ধ্বংসপ্রাপ্ত অফিস ও আদালতগুলো মাইজদী মৌজার খোলা প্রান্তরে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৫৩ সালে শহরের কিছু মৌজা নিয়ে নোয়াখালী পৌর এলাকা ঘোষণা করা হয়। শহরের প্রাণকেন্দ্রে কাটা হয় প্রায় ষোল একর বিশাল দীঘি, যা ‘বড় দীঘি’ নামে পরিচিত। দীঘির চারপাশে চক্রাকারে রাস্তা নির্মাণ করা হয় এবং সরকারী অফিস ও বাংলো আকৃতির ভবনগুলো সেখানে স্থাপন করা হয়। দীঘিটি শহরের জলাধার হিসেবে ব্যবহার করা হতো এবং পাম্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হতো।

মাইজদী দীর্ঘ সময় বিতর্কিত থাকার পর অবশেষে ১৯৬২ সালে নোয়াখালী জেলার স্থায়ী সদরদপ্তর হিসেবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি পায়। জেলার আরেকটি ব্যস্ত শহর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র চৌমুহনী এক সময় মুদ্রণ ও প্রকাশনা ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল।

নোয়াখালীর ইতিহাস প্রমাণ করে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক পরিবর্তন—সবকিছুর মধ্য দিয়ে এই জেলা গড়ে উঠেছে, যা আজো তার সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

সুত্র: noakhali.gov.bd

ফেনী জেলার ইতিহাস: নদীর নামেই জেলার পরিচয়

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window