বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর ইতিহাসে যে কয়জন মানুষ নিরলস শ্রম, সততা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন, প্রকৌশলী মকবুল আহমদ তাঁদের অন্যতম। তাঁর জীবনগাথা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নযাত্রায় এক মানুষের নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও দেশপ্রেমের প্রতিফলন।
১৯৩১ সালের ২৫শে জানুয়ারি, ফেনী জেলার দাগনভূইয়া উপজেলার মনোরম জলয়স্করা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মকবুল আহমদ। পিতা-মাতার স্নেহ ও গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় হওয়া এই মেধাবী ছাত্র শৈশব থেকেই ছিলেন অধ্যয়নপ্রিয় ও শৃঙ্খলাপরায়ণ। স্কুলজীবনের প্রতিটি পর্যায়েই তিনি অর্জন করেন বৃত্তি— যা তাঁর মেধা ও নিষ্ঠার প্রথম স্বীকৃতি হিসেবে আজও স্মরণীয়।
উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিষয়ে অসাধারণ ফলাফল করে তিনি ভর্তি হন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায়। কঠোর অধ্যয়ন, কৌতূহল ও বাস্তব জ্ঞানার্জনের প্রতি আগ্রহ তাঁকে একজন সফল প্রকৌশলী হিসেবে গড়ে তোলে। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি প্রমাণ করেছেন— সৎ উদ্দেশ্য ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা হতে পারে না।
ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৫১ সালে মকবুল আহমদ যোগ দেন তৎকালীন যোগাযোগ ও পূর্ত বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে। এটি ছিল তাঁর পেশাগত জীবনের প্রথম পদক্ষেপ, যেখানে তিনি দ্রুতই নিজেকে একজন দক্ষ, দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তাঁর কাজের প্রতি আন্তরিকতা ও নিখুঁত পরিকল্পনা তাঁকে নিয়ে যায় আরও উচ্চপদে। ১৯৫৩ সালে তিনি যোগ দেন পাকিস্তান রেলওয়েতে, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর “বাংলাদেশ রেলওয়ে” নামে দেশের অন্যতম প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠে।
রেলওয়ে শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়— এটি দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জনজীবনের অন্যতম ভিত্তি। মকবুল আহমদ সেই বাস্তবতাকে খুব ভালোভাবে বুঝতেন। তিনি রেলওয়ের আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা ও সেবার মানোন্নয়নে যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, তা আজও বাংলাদেশ রেলওয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প রেলওয়ের যাত্রীসেবা, সময়নিষ্ঠতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তিনি বিশ্বাস করতেন— টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, এবং সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সমন্বয়। তাঁরই উদ্যোগে অনেক আধুনিক প্রযুক্তি রেলওয়ে ব্যবস্থায় সংযুক্ত হয়, যা আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।
সহকর্মীরা তাঁকে চিনতেন একজন শান্ত, নীরব কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা হিসেবে। তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছিল দৃঢ়তা, তবে তা কখনোই কঠোরতার রূপ নিত না। বরং তিনি প্রতিটি প্রকল্পে টিমওয়ার্ক, সততা এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষ নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন বাংলাদেশ রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে। এ দায়িত্বে থেকে তিনি শুধু প্রশাসনিক নয়, নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর সময়েই রেলওয়ের অনেক বড় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতে মাইলফলক হয়ে ওঠে।
তিনি ছিলেন এমন একজন প্রশাসক যিনি কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব মাঠে কাজ করতে বেশি ভালোবাসতেন। তাই তাঁকে প্রায়ই দেখা যেত স্টেশন পরিদর্শন, কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ শুনতে।
পেশার বাইরে মকবুল আহমদ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, পরিমিত ও পরিবারমুখী একজন মানুষ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি সততা ও দায়িত্ববোধকে প্রাধান্য দিতেন। তাঁর জীবনদর্শন ছিল— “কাজের মাধ্যমে মানুষকে সেবা দেওয়া এবং নীরবে দেশের জন্য অবদান রাখা।”
তিনি প্রবীণ আইনজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ জনাব এম. এ. রউফের জামাতা। পারিবারিক পরিমণ্ডলও ছিল জ্ঞানচর্চা, ন্যায়বোধ ও শিক্ষানুরাগে পরিপূর্ণ— যা তাঁর চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দীর্ঘ কর্মজীবনের পর তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তবে অবসর তাঁর জীবনের গতি থামিয়ে দেয়নি। তিনি এখনো তরুণ প্রকৌশলীদের অনুপ্রেরণার উৎস, এবং তাঁর কর্মদর্শন আজও প্রশাসনিক মহলে উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রকৌশলী মকবুল আহমদের জীবন একটি বার্তা দেয়— সততা, শ্রম ও দায়িত্ববোধ দিয়ে গড়ে তোলা এক কর্মজীবন কখনো বৃথা যায় না। তাঁর কর্মফল আজও দেশের প্রতিটি রেললাইনের শব্দে, প্রতিটি চলমান ট্রেনের গতিতে প্রতিফলিত হয়।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৮, ২০২৫