বাংলার সমাজ ও শিক্ষাক্ষেত্রে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত জনাব মকবুল আহমদ ছিলেন সেই মানুষ, যিনি নীরবে কিন্তু অক্লান্ত পরিশ্রমে সমাজের উন্নয়নে নিজেকে নিবেদন করেছিলেন। নোয়াখালী জেলার নিত্যানন্দপুর গ্রামে ১৯২২ সালে জন্মগ্রহণ করা এই মানুষটি সারাজীবন কাজ করেছেন মানুষের কল্যাণে, শিক্ষার প্রসারে এবং প্রজন্মের উন্নত ভবিষ্যৎ গঠনে।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু হয় নিজ গ্রামের বিদ্যালয়ে, পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান। ১৯৪৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.কম ডিগ্রি অর্জনের পর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন। কর্মজীবনে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের জন্য তিনি সহকর্মী ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত। দীর্ঘ ও সফল কর্মজীবনের শেষে ১৯৮০ সালে তিনি সেকশন অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
কিন্তু মকবুল আহমদের জীবন কেবল চাকরির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজ ও মানুষের কল্যাণ ছিল তাঁর জীবনের মূল প্রেরণা। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি জনসেবামূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৩৭ সালে ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি কলকাতাস্থ নোয়াখালী মুসলিম এসোসিয়েশনের সদস্য হন। সেই সময় থেকেই তিনি সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন।
দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং নোয়াখালী সমিতিকে নতুনভাবে সংগঠিত ও শক্তিশালী করার জন্য অন্যান্য প্রবীণ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একযোগে কাজ শুরু করেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে সংগঠনটি ঢাকায় একটি প্রভাবশালী সামাজিক সংগঠনে পরিণত হয়। দীর্ঘ ২২ বছর তিনি সমিতির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখনো পর্যন্ত সহ-সভাপতির পদে থেকে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
নোয়াখালী সমিতির কর্মকাণ্ডকে প্রসারিত ও আধুনিকীকরণের পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি সমিতির সাহিত্য মুখপত্র ‘মাসিক আল হেরা গ্রাম’ প্রায় বারো বছর সম্পাদনা করেছেন, যা নোয়াখালীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি শুধু তথ্যবহুলই ছিল না, বরং প্রবাসী নোয়াখালীবাসীর হৃদয়ের সঙ্গে এক মেলবন্ধন রচনা করেছিল।
তাঁর নেতৃত্বে নোয়াখালী সমিতির আওতায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সংগঠনের পরিধি ও প্রভাব বৃদ্ধি করে। তিনি সমিতির নিজস্ব ভবন নির্মাণ ও আদমজীনগরে জমি ক্রয়ের কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৩ সালে নোয়াখালী সমিতির প্রথম জুবিলী উৎসব আয়োজনেও তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা।
শিক্ষাক্ষেত্রেও জনাব মকবুল আহমদের অবদান অসামান্য। তিনি নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ ও নিউ মডেল হাই স্কুল প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই দুটি প্রতিষ্ঠান নোয়াখালীর বাইরে থেকেও বহু ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছে। তাঁর প্রেরণায় ও আর্থিক সহায়তায় বহু শিক্ষার্থী আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত।
শুধু শিক্ষা নয়, সামাজিক উন্নয়নেও তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সংগঠক। বর্তমানে তিনি আদনান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির সেক্রেটারি, আজিমপুর এবতেদায়ী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসার চেয়ারম্যান, নোয়াখালী ইতিহাস রচনা পরিষদের সদস্য এবং নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি আরও বহু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আছেন।
মকবুল আহমদ ছিলেন এক সহজ-সরল কিন্তু দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই সমাজসেবার এক একটি দৃষ্টান্ত। তিনি কখনও খ্যাতি বা পুরস্কারের আশায় কাজ করেননি; বরং নীরবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের উপকারেই নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন—একজন মানুষের সাফল্য কেবল নিজের অর্জনে নয়, সমাজকে কতটা এগিয়ে নিতে পেরেছেন, সেটিই প্রকৃত মূল্যায়ন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে জনকল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন।
আজও ঢাকায় ও নোয়াখালীতে যাঁরা তাঁকে চেনেন, তাঁদের কাছে জনাব মকবুল আহমদ এক নির্ভরতার প্রতীক। তিনি ছিলেন সকলের আপনজন—যিনি দূর কলকাতা থেকে শুরু করে ঢাকার ব্যস্ত জীবনে নোয়াখালীর মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের কল্যাণে কাজ করেছেন এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে সমাজসেবার অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছেন।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১২, ২০২৫