বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনেক নারী আছেন, যাঁরা নীরবে কলম ধরেছেন, যাঁদের সৃষ্টির আলো হয়তো প্রকাশের সুযোগ পায়নি, তবুও তাঁদের শব্দ ও অনুভূতি থেকে গড়ে উঠেছে এক অমলিন সৌন্দর্যের জগৎ। বেগম মনির আখতার খাতুন চৌধুরানী ছিলেন তেমনই এক সাহিত্যপ্রেমী, যাঁর জীবনের নীরব সুর বয়ে গেছে কবিতার ছন্দে।

বেগম মনির আখতার খাতুন চৌধুরানীর জন্ম হয় তাঁর মাতুলালয় আলকরায়। তিনি এক শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা পরিবারে বড় হয়েছেন। তাঁর পিতা ছিলেন মরহুম কাজী ফয়েজ বক্স, যিনি সমাজে ন্যায়নিষ্ঠা ও মানবিক গুণে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ফেনী জেলার শরিযাদি গ্রামের সম্মানিত ব্যক্তিত্ব মরহুম আলহাজ্ব রফিকউদ্দীন আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে।

এই পরিবারটি ছিল সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সমাজসেবায় নিবেদিত। স্বামী রফিকউদ্দীন আহমদ চৌধুরী ছিলেন সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি, যিনি মানবসেবাকে নিজের জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সেই পরিবেশেই বেগম মনির আখতার খাতুন গড়ে তুলেছিলেন সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা।

মনির আখতার খাতুন চৌধুরানী মূলত কবি ছিলেন। তাঁর কবিতা ছিল আবেগ, ভালোবাসা, মানবিক বোধ ও আত্মিক অনুভূতির প্রকাশভূমি। জীবদ্দশায় তাঁর একমাত্র প্রকাশিত গ্রন্থ হলো ‘চির সুমধুর’, একটি কবিতার সংকলন। বইটির কবিতাগুলোর ভাষা কোমল, মর্মস্পর্শী এবং একান্তভাবে নারীজীবনের মৃদু আলোছায়ার প্রতিফলন।

‘চির সুমধুর’-এর কবিতাগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়, তিনি শুধু একজন কবি নন, ছিলেন এক সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক—প্রকৃতি, ভালোবাসা, সময় ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল গভীর। তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় হারানো দিনের নস্টালজিয়া, জীবনের নীরব বিষাদ, আবার কখনো মমতার স্নিগ্ধ পরশ।

যদিও তাঁর প্রকাশিত বই একটি, তথাপি তাঁর অপ্রকাশিত কবিতা ও গদ্যের সংখ্যা অনেক। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জীবনের নানা সময় তিনি হাতে লেখা খাতায় কবিতা লিখতেন—কখনো সন্তানদের উদ্দেশে, কখনো প্রিয়জনদের স্মৃতিতে, আবার কখনো কেবল প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে। সেই সব অপ্রকাশিত রচনাই আজ তাঁর সাহিত্যিক মেধার সাক্ষ্য বহন করে।

বেগম মনির আখতার খাতুন চৌধুরানী ছিলেন চার পুত্র ও পাঁচ কন্যার জননী। সংসারের ব্যস্ততা, মাতৃত্বের দায়িত্ব, সামাজিক আচার—সবকিছুর মাঝেও তিনি নিজের ভেতরের শিল্পীসত্তাকে লালন করেছেন। তাঁর সন্তানরাও দেশের সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অসামান্য অবদান রেখেছেন।

তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র কবি বেলাল চৌধুরী বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠ হিসেবে খ্যাত। তাঁর কবিতায় যেমন আন্তর্জাতিক মানবতার বোধ, তেমনি রয়েছে এক নিরন্তর যাযাবর আত্মা—যা হয়তো তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকেই।

দ্বিতীয় পুত্র গিয়াস কামাল চৌধুরী ছিলেন একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক, যিনি দেশীয় সংবাদমাধ্যমে সততা ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার জন্য ব্যাপকভাবে সম্মানিত ছিলেন।

তৃতীয় পুত্র জিয়াউদ্দীন আহমেদ চৌধুরী সমাজসেবায় সক্রিয় থেকে খেলাঘর সংগঠনের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা প্রমাণ করে এই পরিবারে মানবিক চেতনার ধারাবাহিকতা ছিল গভীর ও সুদৃঢ়।

চতুর্থ পুত্র ড. নাসির আহমেদ চৌধুরী, যিনি পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন বিজ্ঞানী, বর্তমানে কুয়েত সরকারের চিফ মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এভাবেই দেখা যায়, বেগম মনির আখতার খাতুনের সন্তানরা প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। এটি তাঁর জীবনদর্শনেরই প্রতিফলন—জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধে পরিবারকে গড়ে তোলাই ছিল তাঁর একান্ত সাধনা।

বেগম মনির আখতার খাতুন চৌধুরানী ১৯৮২ সালের ১৫ই এপ্রিল ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পরও তাঁর স্মৃতি রয়ে গেছে পরিবার, পাঠক ও স্থানীয় সাহিত্যমণ্ডলে। তাঁর কাব্যিক অনুভব, মানবিক স্নেহ এবং মাতৃত্বের সুর আজও তাঁর সন্তানদের লেখায়, ভাবনায় এবং সমাজের সেবামুখী কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়।

তাঁর অপ্রকাশিত কবিতাগুলো যদি সংরক্ষিত ও প্রকাশিত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে বাংলা নারী কবিতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে। কারণ, তাঁর কবিতার ভাষায় আছে যুগের নীরব নারী-মননের স্বর—যা সমাজের পরিবর্তনের ইতিহাসে এক অমূল্য দলিল হয়ে উঠতে পারে।

মনির আখতার খাতুন চৌধুরানীকে শুধু একজন কবি হিসেবে নয়, একজন মমতাময়ী মা ও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবেও স্মরণ করা হয়। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন নারীর সৃজনশীলতা কখনোই পারিবারিক দায়িত্বের বিপরীতে নয়; বরং সেই দায়িত্ববোধই তাঁর সাহিত্যকে করেছে আরও মানবিক, আরও সত্যনিষ্ঠ।

বাংলাদেশের নারী সাহিত্যিকদের ইতিহাসে তিনি নিঃশব্দ অথচ উজ্জ্বল এক নাম—যিনি নিজের কবিতায় ভালোবাসার, সময়ের ও মানবতার সৌন্দর্যকে চির সুমধুর সুরে বুনে গেছেন।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window