বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যারা একাধিক ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতা ও নিষ্ঠার পরিচয় রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম কাজী মফিজুর রহমান—একজন সংগ্রামী ছাত্রনেতা, সফল প্রশাসক এবং মননশীল লেখক। তাঁর জীবন কাহিনি কেবল একটি ব্যক্তির অর্জনের ইতিহাস নয়, বরং একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে আদর্শ, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধ একসূত্রে গাঁথা।
১৯৩৯ সালের ৬ই মার্চ ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া উপজেলার উদরাজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মফিজুর রহমান। তাঁর পিতা মুন্সী ছালামতউল্লাহ ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ ও সৎ মানুষ, যিনি শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে সন্তানকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। মফিজুর রহমান শৈশব থেকেই ছিলেন মেধাবী ও সক্রিয় ছাত্র। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন দাগনভূঁইয়া আতাতুর্ক হাই স্কুলে—যেখানে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বগুণের প্রাথমিক প্রকাশ ঘটে।
১৯৬০ সালে তিনি ফেনী কলেজ থেকে বৃত্তিসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন, যা তাঁর অধ্যবসায় ও শিক্ষানুরাগের স্পষ্ট প্রমাণ। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি শুধু পাঠেই মনোনিবেশ করেননি, বরং সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় আন্দোলনে।
ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন মফিজুর রহমান। তরুণ বয়সে তিনি যে সাহস ও নেতৃত্বের পরিচয় দেন, তা তাঁকে দ্রুতই ছাত্রসমাজের প্রিয় মুখে পরিণত করে। ১৯৬০ সালে তিনি নির্বাচিত হন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি—যে সময়ের রাজনীতি ছিল চরম উত্তেজনা ও আদর্শিক সংঘাতের প্রতীক। সেই সময় তিনি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দিয়ে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করেছিলেন।
তবে ১৯৬৮ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসে যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। প্রথমে পর্যটন বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও প্রশাসনিক বিচক্ষণতা দ্রুতই নজর কাড়ে। কর্মজীবনে নিষ্ঠা ও সততার কারণে তিনি ক্রমে উন্নীত হয়ে ১৯৮৮ সালে ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তরের পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছরই তিনি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন, রেখে যান দীর্ঘ কর্মজীবনের সফল ও সম্মানজনক স্মৃতি।
তবে তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি বড় দিক ছিল সাংবাদিকতা। ছাত্রজীবনেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। ফেনী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘পল্লীবার্তা’ পত্রিকার সঙ্গে তিনি কাজ শুরু করেন। এখান থেকেই তিনি গড়ে তোলেন নিজের লেখনীর ভিত। সাংবাদিকতার প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের কারণে তিনি দ্রুতই জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান।
১৯৬০ সালে দ্য পাকিস্তান অবজারভার–এর প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন মফিজুর রহমান। তাঁর লেখায় ছিল বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং মানবিক সংবেদনশীলতা। পরবর্তীতে তিনি ওই পত্রিকার এডিশন-ইন-চার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি জনপ্রিয় সাহিত্যিক সাময়িকী ‘রবিবাসরীয়’-এর সম্পাদক ছিলেন, যা তাঁর সাহিত্যিক রুচি ও সম্পাদন দক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তিনি পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় ছিলেন সোচ্চার কণ্ঠ। তাঁর সম্পাদিত ও প্রকাশিত লেখাগুলোতে সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিফলন পাওয়া যায়—যা তাঁকে কেবল সাংবাদিক নয়, এক চিন্তাশীল সাহিত্যিক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মফিজুর রহমানের সাহিত্যকর্মও প্রশংসার দাবিদার। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘শোনিত শিরায় যুদ্ধ’, ‘ঢাকা থেকে সিডনি’, ‘এ যুগের মিছিল’, ‘ওরা ক্রিকেট খেলে’, এবং ‘উপর তলার প্রেম’।
এই বইগুলোর বিষয়বস্তু বৈচিত্র্যময়—কখনও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, কখনও বিদেশযাত্রার অভিজ্ঞতা, কখনও সামাজিক সম্পর্ক ও জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতি। তাঁর লেখনিতে ছিল সাংবাদিকতার বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাহিত্যিক সংবেদনশীলতার মিশ্রণ।
ব্যক্তিগত জীবনে মফিজুর রহমান ছিলেন নীতিনিষ্ঠ, বিনয়ী ও সৎ মানুষ। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন বন্ধুসুলভ এবং পরামর্শদাতা, আর ছাত্ররাজনীতির সহযোদ্ধাদের কাছে এক অনুপ্রেরণার উৎস।
তিনি বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতি এবং ফেনী সমিতির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। নিজের এলাকার উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক সহযোগিতামূলক কাজে তিনি সবসময় সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন। প্রশাসনের উচ্চ পদে থেকেও তিনি নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি।
মফিজুর রহমানের জীবন ছিল এক বহুমাত্রিক যাত্রা—যেখানে রাজনীতি, সাংবাদিকতা, প্রশাসন ও সাহিত্য একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর সংগ্রাম, সাংবাদিক হিসেবে তাঁর বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি, প্রশাসক হিসেবে তাঁর নিষ্ঠা, আর লেখক হিসেবে তাঁর সংবেদনশীলতা—সবকিছু মিলেই তাঁকে গড়ে তুলেছে এক পরিপূর্ণ মানুষে।
আজ তাঁর নাম উচ্চারণ করলে স্মরণ করা হয় এক প্রজন্মের সেই সংগ্রামী মননশীল তরুণদের, যারা দেশকে দেখেছিলেন উন্নয়ন, ন্যায় ও মানবতার আলোয় আলোকিত করার স্বপ্নে। মফিজুর রহমান তাঁদেরই একজন, যিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন—একজন মানুষ চাইলে একাধিক ক্ষেত্রেই দেশ ও সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
তাঁর কর্মজীবন, লেখনী ও মানবিক মূল্যবোধ আজও প্রেরণা হয়ে আছে তরুণ প্রজন্মের কাছে—যারা দেশকে ভালোবাসে এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে চায়।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৩, ২০২৫