ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন যাদের জীবন যেন সংগ্রামের একটানা নদী। মুজফ্‌ফর আহমদ—বেশিরভাগের কাছে যিনি পরিচিত “কাকাবাবু” নামে—সেই নদীরই এক অবিচল স্রোত। ১৯শ ও ২০শ শতকের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি ছিলেন সাংবাদিক, সংগঠক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং তীব্র ন্যায়বোধসম্পন্ন একজন মানুষ। তাঁর জীবন কেবল একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের ইতিহাস নয়; বরং এটি এক ব্যক্তির দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ এবং সাহসিকতার গল্প।

১৮৮৯ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ দ্বীপের মুসাপুর গ্রামে জন্মেছিলেন তিনি। গ্রাম, নদীর ধারের মাটির ঘ্রাণ, এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম—এই সবই খুব অল্প বয়সেই তাকে বাস্তবতা শেখায়। বাবার নাম মানসুর আলী। শিক্ষাজীবন শুরু সন্দ্বীপেই; পরে নোয়াখালী জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯১৩ সালে।

পরবর্তীতে তিনি হুগলি মহসিন কলেজে ভর্তি হন, তারপর বঙ্গবাসী কলেজে। কিন্তু একসময় সচরাচর প্রত্যাশিত পথে চলা তাঁর পক্ষে সম্ভব হলো না। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে পড়াশোনা ছাড়তে হলেও জীবনের অন্য পাঠ তাঁর সামনে খুলে যায়—যেখানে বিদ্রোহ, সাহিত্য, সংবাদ এবং রাজনীতি একে একে তার দর্শন গঠন করতে শুরু করে।

১৯১৬ সাল থেকেই তিনি রাজনৈতিক সভা, সাহিত্যচর্চা ও বিতর্কে যুক্ত হতে শুরু করেন। ১৯১৮ সালে তিনি যুক্ত হন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি-তে সহকারী সম্পাদক হিসেবে। শব্দ, কলম এবং বিতর্ক—এই তিন অস্ত্রই তখন তাঁর কাছে রাজনীতির প্রথম পাঠ।

১৯২০ সালে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তিনি প্রকাশ করেন নবযুগ পত্রিকা—যেখানে সমাজ ও রাজনীতিকে নতুন ভাষায়, নতুন তেজে তুলে ধরা হচ্ছিল। পরে নজরুলের আরেক পত্রিকা ধূমকেতু-তেও তিনি “দ্বৈপায়ন” ছদ্মনামে লিখতেন। কবিতা, প্রবন্ধ, সংবাদ—সব মিলিয়ে সেই সময়টাই ছিল এক আগুনের দিন; আর সেই আগুনের কেন্দ্রে তিনি ও নজরুল, হাত ধরাধরি করে।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মুজফ্‌ফর আহমদের নাম অবিচ্ছেদ্য। ১৯২২ সালে কলকাতায় তিনি ‘ভারত সাম্যতান্ত্রিক সমিতি’-র সচিব হন—যা পরবর্তীতে সংগঠিত কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম কাঠামোগুলির একটি।

কিন্তু এই পথ মোটেও সহজ ছিল না।

১৯২৪ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেফতার করে—“কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা”-র মূল আসামি হিসেবে। তাঁর সঙ্গে অভিযুক্ত হন এস.এ. ডাংগে, নলিনী গুপ্ত ও শওকত উসমানি। চার বছরের কারাদণ্ড হয়। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১৯২৫ সালে মুক্তি পান।

মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। একই বছর তিনি নজরুল, হেমন্ত কুমার সরকারসহ অনেককে নিয়ে গড়েন লেবার স্বরাজ পার্টি—যা বৃটিশবিরোধী ও শ্রমিক আন্দোলনের নতুন দিশা দেয়।

১৯২৯ সালে আবার ব্রিটিশ সরকার ৩১ জন শ্রমিকনেতাকে গ্রেফতার করে মীরাটে। সেই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন মুজফ্‌ফর আহমদ। দীর্ঘ বিচার, পর পর অভিযোগ, এবং রাজদ্রোহের তকমা। অবশেষে ১৯৩৬ সালে তিনি মুক্তি পান। কিন্তু সেই সময়টিই তাঁকে কিংবদন্তী করে তোলে—ভারতের শ্রমিক-সংগঠনের ইতিহাসে তিনি হয়ে ওঠেন সবচেয়ে দৃঢ়চেতা কণ্ঠ।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে না থেকে কলকাতায় চলে আসেন—যেখানে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়।
১৯৪৮ সালে ভারতের সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করে; আবারও কারাবাস। ১৯৫১ সালে মুক্তি।
১৯৬২ ও ১৯৬৫—এই দুই বছরেও তাঁকে ফের গ্রেফতার করা হয়। স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি বহুবার রাজনৈতিক বন্দি হয়েছেন; তবুও তাঁর অবস্থান, বিশ্বাস ও কণ্ঠ কখনো নরম হয়নি।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অতি নিরহংকারী, শান্তস্বভাব ও পাঠপ্রেমী একজন মানুষ। তাঁর একমাত্র কন্যা নার্গিসের বিয়ে হয়েছিল কবি আব্দুল কাদিরের সঙ্গে।

তিনি ছিলেন একজন বিশেষ মানের লেখক ও চিন্তাবিদ। তাঁর রচনাগুলো ভারতীয় শ্রমিক রাজনীতি, কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সমকালীন সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ নথি হয়ে আছে। উল্লেখযোগ্য বই—

  • আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি

  • কৃষক সমস্যা

  • নির্বাচিত প্রবন্ধ

  • ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের প্রথম যুগ

  • নজরুল স্মৃতিকথা

প্রতিটি গ্রন্থেই রয়েছে তাঁর আন্দোলনমুখী চিন্তা, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার স্পষ্ট বিশ্লেষণ।

মুজফ্‌ফর আহমদের সংগ্রাম শুধু রাজনৈতিক নয়; তাঁর উত্তরাধিকার বাংলার মননজগতেও বিস্তৃত।

  • ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

  • ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৩৯ সালে।

  • পশ্চিমবঙ্গ সিপিএম-এর দপ্তর আজও তাঁর নাম বহন করে।

  • কলকাতার রিপন স্ট্রিটের নামকরণ হয়েছে মুজফ্‌ফর আহমদ স্ট্রিট।

১৯৭৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান—কিন্তু রেখে গেছেন অসমাপ্ত সংগ্রামের অনিঃশেষ ধারা। তাঁর জীবন যেন জানিয়ে দেয়—
“দমন নয়, আত্মত্যাগই ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যায়।”

Source : wikipedia

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window