বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতিতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁরা একাধারে প্রশাসনিক দায়িত্ব, আইনচর্চা এবং সাহিত্য-গবেষণার মাধ্যমে সমাজে গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তাঁদের মধ্যেই অন্যতম ছিলেন জনাব মুহম্মদ শেহাবুল্লাহ— একজন সুবিবেচক রাজনীতিক, দক্ষ আইনজীবী, এবং ইতিহাসপ্রেমী গবেষক। নোয়াখালীর এই কৃতিসন্তান তাঁর কর্ম ও চিন্তাধারার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, সমাজের উন্নতি কেবল রাজনীতি বা আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনমানুষের চেতনা।

মুহম্মদ শেহাবুল্লাহ ১৯১৮ সালে তৎকালীন নোয়াখালী জেলার সুধারাম উপজেলার ধর্মসুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর শৈশব কেটেছে গ্রামীণ পরিবেশে, যেখানে নৈতিকতা, শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, পরিশ্রমী ও কৌতূহলপ্রবণ।
যে সময় উপকূলীয় অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ছিল সীমিত, সেই সময়ে তিনি দৃঢ় সংকল্প নিয়ে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যান।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তাঁকে ভবিষ্যতে এক অনন্য চিন্তাবিদ হিসেবে গড়ে তোলে। পরবর্তী জীবনে তিনি বুঝতে পারেন, শিক্ষা কেবল পেশাগত নয়— এটি জাতির দিকনির্দেশনার অন্যতম হাতিয়ার।

মুহম্মদ শেহাবুল্লাহর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে, যখন তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৪–৬৫ সালে তিনি পাকিস্তানের পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয় এবং শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ দফতরের সংসদীয় সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই সময় তিনি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, শিল্পোন্নয়ন ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাস্তবভিত্তিক নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উন্নয়নকেন্দ্রিক— তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি দেশের অগ্রগতি নির্ভর করে দক্ষ পরিকল্পনা, সুশাসন ও জনসম্পৃক্ততার ওপর।
সহজ-সাবলীল ভাষায় তিনি সংসদে ও প্রশাসনে উপস্থাপন করতেন দেশের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার বিশ্লেষণ।

তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও সুনাম তাঁকে প্রশাসনিক মহলে এক নীতিনিষ্ঠ ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তিনি রাজনীতি ও প্রশাসনকে দেখেছিলেন জনগণের সেবার মাধ্যম হিসেবে, লাভের উৎস নয়— যা আজকের সময়েও এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি মুহম্মদ শেহাবুল্লাহ ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী।
তিনি আইনকে কেবল পেশা নয়, সমাজে ন্যায় ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অন্যতম পথ হিসেবে দেখতেন। আদালতে তাঁর বক্তব্য ছিল যুক্তিনিষ্ঠ, তথ্যসমৃদ্ধ ও মানবিক মূল্যবোধে ভরপুর।

তাঁর আইনি চর্চার মাধ্যমে তিনি বহু তরুণ আইনজীবীর পরামর্শদাতা ও অনুপ্রেরণার উৎস হন।
আইনের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও সততা তাঁকে সহকর্মী মহলে বিশেষ সম্মান এনে দেয়।
তাঁর বিশ্বাস ছিল— “ন্যায়বিচার তখনই পরিপূর্ণ, যখন তা সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছায়।” এই দর্শনই তাঁকে আইনজীবী হিসেবে আলাদা করে তোলে।

রাজনীতি ও আইনের বাইরে মুহম্মদ শেহাবুল্লাহ ছিলেন একজন ইতিহাসপ্রেমী গবেষক ও লেখক। তিনি বর্তমানে (অবসরের পর) দুইটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করেন—
১️⃣ “নোয়াখালী জেলার ইতিহাস”,
২️⃣ “মওলানা ইনামউদ্দীন বাঙ্গালী (রঃ)”–এর জীবনী।

‘নোয়াখালী জেলার ইতিহাস’ বইটিতে তিনি জেলার ভৌগোলিক গঠন, সাংস্কৃতিক বিবর্তন, শিক্ষানবীশ আন্দোলন, এবং রাজনৈতিক ভূমিকার বিশদ বর্ণনা দেন।
এই গ্রন্থটি ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা ও সংগ্রহের ফল। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির ইতিহাস সংরক্ষণ করা মানে তার আত্মপরিচয়কে অক্ষুণ্ণ রাখা।

অন্যদিকে “মওলানা ইনামউদ্দীন বাঙ্গালী (রঃ)” জীবনীটি ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক ও মানবিক অনুসন্ধানের প্রতিফলন।
এই জীবনীতে তিনি তুলে ধরেন ধর্মীয় মানবতাবাদ, সামাজিক সংস্কার ও শিক্ষার দিক থেকে এক অনন্য চিন্তার প্রতিচ্ছবি।
তাঁর লেখায় ইতিহাস কেবল তথ্য নয়, বরং মানুষের জীবনের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

মুহম্মদ শেহাবুল্লাহ ছিলেন এক নীরব কর্মবীর। রাজনীতিতে যেমন তিনি দুর্নীতিমুক্ত চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তেমনি আইনের চর্চায় থেকেও তিনি ছিলেন মানবিকতার প্রতীক।
তাঁর ব্যক্তিজীবন ছিল সাদাসিধে, কিন্তু চিন্তাজগৎ ছিল গভীর ও প্রখর।

তিনি বিশ্বাস করতেন— সমাজে নেতৃত্ব মানে কেবল পদাধিকার নয়, বরং সেবা, সততা ও দায়িত্ববোধের সম্মিলন।
এই মূল্যবোধই তাঁকে সমকালীন রাজনীতিবিদদের মধ্যে আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অবসরজীবনে তিনি লেখালেখি, গবেষণা ও তরুণ প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা দেওয়াতেই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন।
তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আজকের তরুণ সমাজের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ— কীভাবে দায়িত্ববোধ, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায়।

মুহম্মদ শেহাবুল্লাহ ছিলেন সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে সমাজের কল্যাণকে বড় করে দেখেছেন।
তিনি রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, আইনজীবী, এবং ইতিহাসবিদ— সব ভূমিকাতেই ছিলেন একাগ্র, সৎ ও নিষ্ঠাবান।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে ন্যায়, জ্ঞান ও মানবতার প্রতীক হিসেবে।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window