বাংলাদেশের আধুনিক প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যারা দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও নিবেদিতপরায়ণতার সমন্বয়ে দেশের জন্য স্থায়ী অবদান রেখেছেন। মুহম্মদ সিরাজউদ্দীন তাদের মধ্যে একজন, যিনি একদিকে ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান প্রশাসক, অন্যদিকে একজন তীক্ষ্ণ চিন্তাশীল সাংবাদিক ও লেখক। তাঁর জীবন কেবল সরকারি দায়িত্বের ইতিহাস নয়, বরং এক দেশপ্রেমিক মননের প্রমাণ।

মুহম্মদ সিরাজউদ্দীন ১লা জানুয়ারি ১৯৩৬ সালে বেগমগঞ্জ উপজেলার রামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন এক সৎ ও শিক্ষানুরাগী মানুষ। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অধ্যবসায়ী ও বিচক্ষণ। শিক্ষাজীবনের প্রথম ধাপ শেষে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে ইতিহাস বিষয়ে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৬১ সালে। শিক্ষাজীবনের প্রতি গভীর মনোযোগ এবং জ্ঞানার্জনের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে দ্রুত প্রগতিশীল ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তকের মর্যাদায় পৌঁছে দেয়।

১৯৬২ সালে মুহম্মদ সিরাজউদ্দীন সি.এস.পি. (Civil Service of Pakistan) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। সেবার শুরুতেই তিনি দেখান প্রশাসনিক দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও দৃষ্টিভঙ্গি। পরবর্তীতে তিনি বৃটেনের ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রশাসনিক তত্ত্বের উপর পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন, যা তাঁর প্রশাসনিক ও পরিকল্পনাগত দক্ষতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

ছাত্রাবস্থায়ই মুহম্মদ সিরাজউদ্দীন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দৈনিক ইত্তেফাকদেনিক মিল্লাত পত্রিকায় সাব-এডিটর হিসেবে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে পাক জুমহুরিয়াত পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিক জীবনে তাঁর লেখা এবং সম্পাদনা ধারা ছিল বিশ্লেষণধর্মী, তথ্যসমৃদ্ধ এবং সমাজ সচেতন। পরে তিনি বাংলাদেশ ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার এর জেনারেল এডিটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন, যেখানে তাঁর পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন স্পষ্ট দেখা যায়।

প্রশাসনের ক্ষেত্রে মুহম্মদ সিরাজউদ্দীন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সচিব। এর আগে তিনি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে এই প্রতিষ্ঠানগুলি কার্যক্রমে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও পরিকল্পনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেছে।

মুহম্মদ সিরাজউদ্দীনের লেখনীর মধ্য দিয়ে দেখা যায় তাঁর বিশ্লেষণধর্মী মনন এবং শিক্ষাদানপ্রবণতা। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—Institutional Support for Planning and Project Management’, ‘কুটির শিল্প ‘বিচ্ছিন্ন অনুভূতি’, ‘Project Management: A Compilation of Lecture Materials’, এবং ‘History of Modern Europe’। এসব গ্রন্থে প্রশাসন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, শিল্প উন্নয়ন এবং ইতিহাসের বিষয়ে তাঁর গভীর উপলব্ধি প্রতিফলিত হয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবনে মুহম্মদ সিরাজউদ্দীন ছিলেন শান্ত, বিনয়ী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রেরণার উৎস, এবং শিক্ষার্থীদের কাছে আদর্শ শিক্ষক ও পরামর্শদাতা। তাঁর দূরদৃষ্টি, সংগঠনী দক্ষতা এবং দেশপ্রেম তাঁকে একটি বহুমুখী ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

মুহম্মদ সিরাজউদ্দীনের জীবন ও কর্ম তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, সাংবাদিকতার প্রজ্ঞা এবং লেখনী শক্তি আজও বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রভাবশালী। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, দেশপ্রেম, অধ্যবসায় এবং দক্ষতার সংমিশ্রণে একজন মানুষ একাধিক ক্ষেত্রে দেশের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window