বাংলা সাহিত্যে ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস রচনার এক বিশেষ ধারা রয়েছে—যেখানে অতীতের ঘটনা ও ব্যক্তিত্ব জীবন্ত হয়ে ওঠে সাহিত্যিক কল্পনার আলোয়। এই ধারার এক উজ্জ্বল নাম মেসবাহুল হক। তিনি ছিলেন একাধারে প্রতিভাবান কথাসাহিত্যিক, গবেষক এবং ইতিহাসপ্রেমী, যিনি উপন্যাসের কাঠামোয় ঐতিহাসিক সত্যকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন গভীর মানবিক বোধে।
মেসবাহুল হক ১৯২৭ সালে নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী সোনাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা। ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বে তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। স্থানীয় বিদ্যালয়ে পড়াকালীনই তিনি ইতিহাস বিষয়ক গল্প ও প্রবন্ধ লেখায় মনোনিবেশ করেন। বই পড়া, লোককথা শোনা ও অতীতের কাহিনি নিয়ে কৌতূহল ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।
গ্রামের নদী, খাল, ঐতিহ্যবাহী পল্লিজীবন ও প্রবীণদের মুখে শোনা ইতিহাস তাঁর কিশোর মনকে অনুপ্রাণিত করেছিল অতীতকে জানার এবং তাকে সাহিত্যে রূপ দেওয়ার জন্য। এই আগ্রহই পরবর্তীতে তাঁকে ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস রচনার পথে নিয়ে যায়।
মেসবাহুল হক তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু করেন গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। কিন্তু খুব শিগগিরই তিনি উপলব্ধি করেন—ইতিহাসই তাঁর সৃষ্টিশীলতার প্রধান প্রেরণা। অতীতের ঘটনাগুলোকে তিনি কেবল তথ্য হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের ভাগ্য, সমাজব্যবস্থা ও সময়ের পরিবর্তনের ধারায় ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করেছেন সৃজনশীল দৃষ্টিতে।
তাঁর সবচেয়ে আলোচিত গবেষণাধর্মী রচনা ‘পলাশী যুদ্ধোত্তর মুসলিম সমাজ’—বাংলা ও ভারতের ইতিহাস গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এতে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন পলাশী যুদ্ধের (১৭৫৭) পরবর্তী সময়ের সামাজিক পরিবর্তন, মুসলিম সমাজের পতন ও পুনরুত্থানের ইতিহাস। বইটি প্রকাশের পর শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যপ্রেমী মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এরপর প্রকাশিত হয় তাঁর আরেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ‘নীল বিদ্রোহ’, যা ১৮৫৯-৬০ সালের বাংলার কৃষক আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে লেখা। এই গ্রন্থে তিনি নিপীড়িত কৃষকদের বঞ্চনা, ঔপনিবেশিক শক্তির শোষণ এবং জাতিগত-সামাজিক প্রতিরোধের কাহিনি তুলে ধরেন অসাধারণ বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে। ইতিহাসের তথ্যনির্ভর কাঠামো ও সাহিত্যের প্রাণময় ভাষা একত্রে মিশে গেছে এই রচনায়।
মেসবাহুল হকের লেখার ভুবন বৈচিত্র্যময়। গবেষণাধর্মী বইয়ের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন বেশ কিছু উপন্যাস ও প্রবন্ধগ্রন্থ, যেখানে ইতিহাসের সঙ্গে মানবজীবনের দার্শনিক প্রশ্নগুলো একাকার হয়ে গেছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
‘পূর্বদেশ’
-
‘জাহাঙ্গীর নগর থেকে রাজমহল’
-
‘আরেক পৃথিবী’
-
‘শতাব্দীর ডাক’
এই বইগুলোতে তিনি ইতিহাসকে কেবল অতীতের দলিল হিসেবে নয়, বরং বর্তমান মানবসমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ‘জাহাঙ্গীর নগর থেকে রাজমহল’ উপন্যাসে মেসবাহুল হক তুলে ধরেছেন মধ্যযুগীয় বাংলার রাজনীতি, সংস্কৃতি ও নগরজীবনের উত্থান-পতনের চিত্র। অন্যদিকে ‘আরেক পৃথিবী’ উপন্যাসে তিনি মানবতার চিরন্তন অনুসন্ধানকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মেলাতে চেয়েছেন।
তাঁর ভাষা ছিল সাবলীল, অথচ তথ্যনিষ্ঠ; কাহিনির বুননে ছিল দৃঢ় বাস্তবতা, আবার মানবিক অনুভবের কোমলতা। পাঠক যেন ইতিহাসের বই নয়, এক জীবন্ত সময়ের গল্প পড়ছেন—এটাই ছিল মেসবাহুল হকের লেখনীর বৈশিষ্ট্য।
মেসবাহুল হক কেবল গল্পকার নন, ছিলেন একনিষ্ঠ গবেষক। তিনি গ্রন্থাগারে, পুরনো দলিলে, নথিপত্রে ও ঐতিহাসিক স্থানে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতেন। তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য ছিল ইতিহাসকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা—যাতে পাঠক ইতিহাসকে কেবল দূর অতীতের ঘটনা হিসেবে নয়, নিজের বর্তমানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে উপলব্ধি করতে পারেন।
‘পলাশী যুদ্ধোত্তর মুসলিম সমাজ’ বইটির মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে এক রাজনৈতিক বিপর্যয় গোটা সমাজের সাংস্কৃতিক ও মানসিক কাঠামোকে বদলে দেয়। এভাবেই তিনি ইতিহাসচর্চাকে কেবল গবেষণার বিষয় নয়, বরং জীবনের পাঠে পরিণত করেছিলেন।
মেসবাহুল হক ছিলেন নীরবচিন্তক, বিনয়ী ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। সহকর্মী ও পাঠকমহলে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন শান্ত, মননশীল লেখক হিসেবে। সাহিত্য ও ইতিহাস—এই দুই জগতের সেতুবন্ধন রচনার ক্ষেত্রে তিনি এক অনন্য ভূমিকা রাখেন।
তাঁর লেখার প্রভাব আজও অনুভব করা যায় ইতিহাসভিত্তিক বাংলা সাহিত্যে। অনেক নতুন লেখক তাঁর রচনাশৈলী অনুসরণ করেছেন, বিশেষ করে ঐতিহাসিক তথ্যকে সাহিত্যিক আবহে রূপান্তরের ক্ষেত্রে।
মেসবাহুল হকের জীবনের নির্দিষ্ট সমাপ্তির তারিখ জানা না থাকলেও, তাঁর রচনাগুলোই আজ তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মারক হয়ে আছে—যা প্রমাণ করে, সময়ের সীমা পেরিয়ে একজন লেখকের চিন্তাধারা কীভাবে অমর হয়ে থাকতে পারে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ২২, ২০২৫