বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের নীরব অথচ দৃঢ় নেতৃত্ব দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন মোশতাক আহমদ চৌধুরী—একজন মেধাবী কর্মকর্তা, দক্ষ সংগঠক ও নিষ্ঠাবান প্রশাসক, যিনি জীবনের বড় অংশ উৎসর্গ করেছেন দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় জন্ম নেওয়া মোশতাক আহমদ চৌধুরীর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে নোয়াখালী অঞ্চলের প্রাণবন্ত পরিবেশে। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষানুরাগী ও মূল্যবোধে দৃঢ়। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন পরিশ্রমী, মনোযোগী ও অধ্যবসায়ী ছাত্র। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হন নোয়াখালী জেলা স্কুলে, যেখানে তিনি মেধার পরিচয় দিয়ে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন ঢাকা কলেজে, তৎকালীন সময়ে যা ছিল উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখান থেকেও তিনি চমৎকার ফলাফল অর্জন করেন।
তাঁর উচ্চশিক্ষার পরবর্তী গন্তব্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপেই তিনি জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বগুণের পরিচয় দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি শুধু অধ্যয়নে নয়, জাতীয় বিষয় নিয়েও আগ্রহী ছিলেন—যা তাঁর পরবর্তী প্রশাসনিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
১৯৫৬ সালে মোশতাক আহমদ চৌধুরী পাকিস্তান সুপিরিয়র সার্ভিসে (CSP) যোগ দেন, যা তখনকার সময়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ক্যাডার ছিল। সেই সঙ্গে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় কর্মজীবন। তিনি পাকিস্তান রেলওয়েতে কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে পদোন্নতির মাধ্যমে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি নবগঠিত বাংলাদেশের রেলওয়ে বিভাগে তাঁর অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করেন। প্রশাসনিক দক্ষতা, পরিকল্পনাগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে তিনি বাংলাদেশ সরকারের রেলওয়ে বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। পাশাপাশি অতিরিক্ত মহাপরিচালক (Additional Director General) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, যা রেলওয়ে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পদগুলোর একটি।
তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে গৃহীত নানা পদক্ষেপ আজও প্রশংসিত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রেলওয়ে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত—লাইনের ক্ষতি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং যন্ত্রপাতির অভাব সর্বত্র। সেই কঠিন সময়ে মোশতাক আহমদ চৌধুরী নিরলসভাবে কাজ করেছেন রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে। তাঁর উদ্যোগে শুরু হয় রেলওয়ের আধুনিকীকরণ, যাত্রীসেবার উন্নতি এবং নতুন রেল রুটের পরিকল্পনা।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় তিনি নিয়ে আসেন শৃঙ্খলা, দক্ষতা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা। তাঁর নেতৃত্বে রেলওয়ে প্রশাসন পায় একটি কার্যকর ও পরিকল্পিত কাঠামো। তিনি শুধু অফিসে বসে নির্দেশনা দেননি—নিজে সরেজমিন পরিদর্শনে যেতেন, কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতেন, এবং সমস্যা সমাধানে হাতে-কলমে নির্দেশনা দিতেন।
জনাব চৌধুরীর কর্মদক্ষতা শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নয়, মানবিক দিকেও প্রশংসনীয় ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, রেলওয়ে শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অংশ। তাই তাঁর পরিকল্পনায় সবসময় ছিল যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা, এবং কর্মীদের কল্যাণ।
তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে স্মরণ করেন একজন নীরব কিন্তু প্রভাবশালী নেতা হিসেবে—যিনি কঠোর পরিশ্রম ও নৈতিকতার মেলবন্ধনে কাজ করতেন। তিনি কখনোই ব্যক্তিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেননি; বরং দেশের স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠানের সুনামকে সর্বাগ্রে রেখেছেন।
রেলওয়ের পুনর্গঠন ও উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় মোশতাক আহমদ চৌধুরীর অবদান আজও অনস্বীকার্য। তাঁর পরিকল্পিত কর্মধারা বাংলাদেশের রেল নেটওয়ার্ককে আধুনিকীকরণের ভিত্তি গড়ে দেয়। পরবর্তীকালে যে উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, তার অনেকগুলোর বীজ রোপণ হয়েছিল তাঁর সময়েই।
তিনি প্রশাসনের এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা দেশকে ভালোবেসেছেন কাজের মাধ্যমে। তাঁর মতো কর্মকর্তাদের সততা, মেধা ও দূরদৃষ্টি আজও তরুণ প্রশাসকদের জন্য প্রেরণার উৎস।
মোশতাক আহমদ চৌধুরীর জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন নিষ্ঠাবান প্রশাসক কেবল দায়িত্ব পালনই করেন না, বরং তিনি ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত রেখে যান। তাঁর অবদান বাংলাদেশের রেলওয়ের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে, এবং তিনি স্মরণীয় থাকবেন একজন দেশপ্রেমিক, কর্মঠ ও নিবেদিতপ্রাণ প্রশাসক হিসেবে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৪, ২০২৫