মোহাম্মদ ইসহাক ১৯১০ সালে বাংলাদেশের রামগঞ্জ উপজেলার হাশিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল। ইতিহাসে গভীর অনুরাগ এবং জ্ঞানের তৃষ্ণা তাঁকে অন্য শিক্ষার্থীদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। পরিবারিক পরিবেশ এবং স্থানীয় শিক্ষার সুযোগ তাঁকে প্রথম দিক থেকেই আত্মনির্ভর ও চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

১৯৩৭ সালে ইসহাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে প্রথম শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সাফল্যের সঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে যোগদান করেন, যা তখনকার সময়ে শিক্ষাবিদ হিসেবে একটি বিশাল সম্মানিত পদ ছিল। তাঁর অধ্যাপনার শৈলী এবং শিক্ষাদানের মান শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। দুই বছরের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার পর তিনি সরকারি কলেজে যোগদান করেন। এরপরের দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি ঢাকার, রাজশাহীর, হুগলীর এবং সিলেটের বিভিন্ন এম.সি কলেজে অধ্যাপনা করেন। এই দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে ইতিহাসের জগতে পথপ্রদর্শক হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

১৯৬২ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত তিনি বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যক্ষ হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছিল। পরবর্তীতে, ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ গেজেটিয়ারের পদে কর্মরত থাকেন এবং সেই থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সংরক্ষণমূলক কাজ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

মোহাম্মদ ইসহাক শুধু একজন শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি একজন উজ্জ্বল লেখক ও গবেষক হিসেবেও খ্যাত। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৫০টি। তাঁর রচনায় ইতিহাসের গভীর বিশ্লেষণ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সাংস্কৃতিক দিকগুলো সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • “History of Indo-Pakistan” – যা উপমহাদেশের ইতিহাসকে বিস্তৃত ও বিশদভাবে আলোকপাত করে।
  • “Romance of East Bengal” – যা পূর্ববঙ্গের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের রোমান্সময় দিক তুলে ধরে।
  • “পাক-ভারতের ইতিহাস” – যা পাকিস্তান ও ভারতের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত এবং তথ্যনির্ভর ব্যাখ্যা প্রদান করে।
  • “ইসলামের অভিনব ইতিহাস” – যেখানে ইসলামের ইতিহাসের অজানা দিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়।

তাঁর গবেষণা ও লেখার মূল লক্ষ্য ছিল ইতিহাসকে শিক্ষণীয়, বোধগম্য এবং পাঠকের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা। শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর গ্রন্থ এবং গবেষণা আজও শিক্ষামূলক মানে সমৃদ্ধ।

মোহাম্মদ ইসহাকের জীবনের সারা পথটাই শিক্ষার প্রতি নিবেদন, ইতিহাসের প্রতি নিষ্ঠা এবং দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধে পরিপূর্ণ ছিল। শিক্ষকতা, প্রশাসনিক কাজ এবং গবেষণার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে অমুল্য অবদান রেখেছেন। তাঁর জীবন শিক্ষার পথে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য আজও এক অনুপ্রেরণার চিরন্তন দিকনির্দেশ।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window