এক দক্ষ সৈনিক, সাহসী কমান্ডার ও সমাজসেবী ব্যক্তি, যিনি বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে সাহসিকতা, নেতৃত্বগুণ ও দায়িত্বপরায়ণতার নিদর্শন হয়ে আছেন। তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতিটি অধ্যায় প্রমাণ করে যে একনিষ্ঠতা, দক্ষতা এবং দেশপ্রেমের সমন্বয়ে মানুষের সেবা ও দেশের উন্নয়ন সম্ভব।
১৯৩২ সালে নোয়াখালীর সুধারাম উপজেলার অশ্বধিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জনাব ওয়াজীউল্লাহ। পিতা মরহুম মৌলভী আজিজুর রহমান ছিলেন নোয়াখালী জেলা স্কুলের একজন সম্মানিত শিক্ষক। পিতার নৈতিকতা, শিক্ষাব্যবস্থাপনা ও পরিশ্রমের মূল্যবোধ থেকে প্রভাবিত হয়ে ওয়াজীউল্লাহ শৈশব থেকেই ছিলেন অধ্যবসায়ী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও লক্ষ্যনিষ্ঠ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নেন নোয়াখালী জেলা স্কুলে এবং উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি সামরিক জীবনের দিকে আগ্রহী হন। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমি, কাকুল থেকে ১৮ বেলুচ রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। কমিশন পাওয়ার পর থেকেই তাঁর সাহস, দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণের খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তান রেনজার্সের সুলেমান কি ফজেলকা সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি ভারতের পাঞ্জাবের বিস্তীর্ণ এলাকা—জি, জি-১ থেকে জি, জি-৮ পর্যন্ত—দখলে নিয়ে আসেন। এই বীরত্বপূর্ণ অভিযান তাঁকে সম্মানিত করেন এবং প্রমাণিত হয় যে তিনি কেবল সাহসী পাইলট বা সেনা অফিসারই নন, বরং একজন কৌশলী কمان্ডার।
১৯৬৬ সালে কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে তিনি পি.এস.সি. (Passed Staff College) ডিগ্রি অর্জন করেন। এই উচ্চতর প্রশিক্ষণ তাঁকে কৌশলগত নেতৃত্ব, আধুনিক সামরিক নীতি ও পরিচালনায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলে। স্বাধীনতার পর, ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে তিনি ৯ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে কর্ণেল পদে উন্নীত হন এবং একই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ রাইফেলস্-এর উপ-মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পান।
১৯৭৭ সালে ব্রিগেডিয়ার ও ১৯৮১ সালে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। ১৯৭৬ সালে তিনি আমী সদর দফতরের পরিচালক (পারসোনাল এডমিনিস্ট্রেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, শৃঙ্খলাবোধ এবং নেতৃত্বগুণের প্রমাণ ফুটে ওঠে। সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।
অবসরগ্রহণের পরও তিনি দেশের সেবায় অবদান রাখতে থেমে থাকেননি। ১৯৮২ সালের ১২ এপ্রিল তাঁকে বাংলাদেশ আনসারের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৩রা নভেম্বর ১৯৮৭ পর্যন্ত এই পদে থাকাকালীন সময়ে তিনি আনসার বাহিনীকে আধুনিকীকরণ, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং জনসাধারণের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই সময় তিনি দেশের নিরাপত্তা, জনসেবা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডে সমন্বয় নিশ্চিত করেন।
সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সময়ে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোতে সফর করেন, যেখানে আন্তর্জাতিক সামরিক কৌশল, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর মনোযোগী হন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দক্ষ নেতৃত্বগুণ সম্পন্ন কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বর্তমানে মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ওয়াজীউল্লাহ অবসর গ্রহণের পর সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছেন। তিনি স্থানীয় সম্প্রদায়ের কল্যাণ, শিক্ষা ও স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁর জীবনযাত্রা প্রমাণ করে যে একজন সেনা অফিসার শুধু সীমান্তরক্ষা করাই নয়, বরং দেশের সার্বিক উন্নয়নে, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সমাজসেবায়ও অবদান রাখতে পারেন।
ব্যক্তিগত জীবনে জনাব ওয়াজীউল্লাহ ছিলেন নম্র, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও মানবিক। সহকর্মীরা তাঁকে মনে রাখেন একজন ন্যায্য ও নৈতিক সৈনিক হিসেবে, যিনি দায়িত্ব, সততা ও দেশের প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেছেন। তরুণ সেনা কর্মকর্তা ও সমাজসেবীদের জন্য তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস।
মোহাম্মদ ওয়াজীউল্লাহর জীবনগাথা বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাস ও জনসেবার এক অনন্য অধ্যায়। সাহসিকতা, নেতৃত্বগুণ, দায়িত্বপরায়ণতা এবং সমাজসেবার সমন্বয়ে তিনি দেশের জন্য এক অমর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৪, ২০২৫