মোহাম্মদ তোয়াহা (২ জানুয়ারি ১৯২২ – ২৯ নভেম্বর ১৯৮৭) ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির কর্মী, প্রগতিশীল রাজনীতির এক দৃঢ় ভাবধারক এবং বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ভাষার অধিকার প্রশ্নে তিনি যেমন ছিলেন নির্ভীক, তেমনি উপনিবেশবিরোধী ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে তার দৃঢ় অবস্থান তাকে এক অনন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনীতির প্রতিটি ধাপেই তিনি নিজস্ব আদর্শ নিয়ে অটল ছিলেন।

১৯২২ সালের ২ জানুয়ারি তৎকালীন নোয়াখালী জেলার রামগতি উপজেলার হাজিরহাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ তোয়াহা। তার পিতা হাজী মোহাম্মদ ইয়াসিন ও মাতা হাসনা বানু। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ও চিন্তাশীল ছিলেন, আর সেই মানসিকতা তার শিক্ষাজীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে। ফরাশগঞ্জ স্কুল থেকে ১৯৩৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি ঢাকায় এসে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ১৯৪১ সালে আইএ সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকের পথে যাত্রা শুরু করেন। ১৯৪৪ সালে স্নাতক এবং ১৯৫০ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের মধ্য দিয়ে তার শিক্ষাজীবন পরিপূর্ণতা পায়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ১৯৪৭ সালের আগস্টে ফজলুল হক হলের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ছাত্রজীবনেই আন্দোলনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক চেতনা তার চরিত্রকে গড়ে তোলে।

রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী উত্তাল সময়ে। ১৯৪৬ সালে আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে সিলেট গণভোটে তিনি মাঠপর্যায়ে কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বামপন্থী ছাত্র সংগঠন — পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশন। আদর্শিক দিক থেকে তিনি ছিলেন মার্কসবাদী, তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রের বাস্তব সমীকরণে তিনি ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগেও যুক্ত হন। প্রগতিশীল রাজনীতির পরিসর তখনো সদ্য বিকাশমান, আর তোয়াহার মতো সংগঠকের উপস্থিতি সেই পরিসরকে আরও শক্তিশালী করে।

মোহাম্মদ তোয়াহা ভাষা আন্দোলনের প্রথম দিককার সংগঠকদের মধ্যে অন্যতম। আন্দোলন শুরুর সময় থেকেই তিনি পোস্টার, লিফলেট ও প্রচারসামগ্রী তৈরি করতেন, যা ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে তার নেতৃত্বে একটি দল মুখ্যমন্ত্রী খান নাজিমুদ্দিনের কাছে স্মারকলিপি দিতে গেলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন এবং অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির অন্যতম নেতার ভূমিকায় তিনি সরকারের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি হিসেবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এলে তিনি বাংলা ভাষার দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করেন। সরকার যখন আরবি লিপিতে বাংলা লেখার প্রস্তাব তোলে, তখন তোয়াহা সরাসরি এর প্রতিবাদ জানিয়ে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালের শেষদিকে ছাত্ররাজনীতিতে গভীরভাবে যুক্ত থাকার অপরাধে আবারও তিনি গ্রেফতার হন।

কারামুক্ত হওয়ার দুই বছর পর তিনি ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেন এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি শ্রমিক রাজনীতির দিকে মনোনিবেশ করেন এবং ১৯৫৬ সালে গঠন করেন পূর্ব পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশন, যার সভাপতি হন তিনি নিজেই। একই বছর তিনি পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটিতে সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৫৭ সালে তিনি ভাসানীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে তিনি গোপনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনতার যুদ্ধের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তোয়াহার অবস্থান ছিল জটিল। নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর ও রামগতি অঞ্চলে তিনি একই সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই পরিচালনা করেন। তার দল যুদ্ধকে “দুই কুকুরের লড়াই” বলে আখ্যায়িত করে। ফলে সেই সময় তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

স্বাধীনতার পর তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ১৯৭৬ সালে পরোয়ানা প্রত্যাহার হলে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য হন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে তিনি আট-দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

১৯৮৭ সালের ২৯ নভেম্বর লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতির নিজ এলাকা হাজিরহাটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার রাজনৈতিক জীবন নানা বিতর্ক, আদর্শিক লড়াই ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠলেও ভাষা আন্দোলন, শ্রমিক রাজনীতি ও বামধারার বিকাশে তার ভূমিকা আজও গভীরভাবে স্মরণীয়।

Source : wikipedia

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window