একজন প্রখ্যাত চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট, ব্যবসা প্রশাসক এবং সমাজসেবী, যিনি পেশাগত দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ এবং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তাঁর জীবন ও কর্মগাথা প্রমাণ করে যে সেবা, সততা এবং দায়িত্বপরায়ণতা একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকে সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী করে।

জনাব মোহাম্মদ তোহা ১৯৩৬ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি বেগমগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৌলভী আলীউল্লাহ মিয়া ছিলেন নৈতিকতা ও শিক্ষার মানদণ্ডের একজন প্রেরণাদায়ক ব্যক্তি। শৈশব থেকেই তোহার মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এবং অধ্যবসায়ের মনোভাব লক্ষ্যযোগ্য ছিল।

শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী। তিনি করাটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে এম.কম এবং ১৯৬১ সালে এল.এল.বি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি ইনস্টিটিউট অব চাটার্ড একাউন্ট্যান্টস অব পাকিস্তান থেকে চাটার্ড একাউন্টেসি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে তিনি ইনস্টিটিউট অব চাটার্ড একাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ-এর ফেলো হন। ১৯৭৯ সালে লন্ডন বিজনেস স্কুল থেকে উচ্চতর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও প্রশাসনে দক্ষতা অর্জন করেন।

পেশাজীবন শুরু করেন ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা-তে যোগদানের মাধ্যমে। ১৯৬২ পর্যন্ত তিনি পি, আই, ডি, সি.আই.আর-এর বিভিন্ন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, বিশেষ করে বাজেট নিয়ন্ত্রণ, বিশ্লেষণ ও পরিসংখ্যাণ ক্ষেত্রে। ১৯৬০ সালে করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিষয়ে পরীক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন।

এরপর ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ইস্টার্ন রিফাইনারী, চট্টগ্রাম-এ হিসাব বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি চাটার্ড একাউন্ট্যান্টস পেশায় আত্মনিয়োগ করেন এবং ১৯৭৮ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের পুঁজিপ্রত্যাহার সেলের ফাইন্যান্সিয়াল কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের অর্থ পরিচালক পদে যোগদান করেন এবং তিন বছর এই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। এরপর ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের অর্থ পরিচালক পদে নিযুক্ত হন এবং তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। ১২ই এপ্রিল ১৯৮৮ থেকে ৭ই অক্টোবর ১৯৮৮ পর্যন্ত তিনি বিসিআইসি-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের সদস্য পরিচালক হিসেবে এবং ২২শে জানুয়ারি ১৯৮৯ থেকে পুনরায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

জনাব তোহা পেশাগত জীবনের পাশাপাশি সমাজসেবায়ও সক্রিয় ছিলেন। তিনি বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৮৩-৮৪ ও ১৯৮৪-৮৫ সালে তিনি বাংলাদেশ লায়ন্স ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি ছিলেন এবং আজীবন সদস্য হিসেবে দুস্থ মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর দীর্ঘদিনের সমাজসেবা এবং নেতৃত্বের স্বীকৃতিতে তিনি আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক এবং শ্রীজ্ঞাণ অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক লাভ করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে জনাব মোহাম্মদ তোহা ছিলেন সেবা-প্রাণ, ধর্মপ্রাণ ও বিচক্ষণ। সহকর্মীরা ও সমাজের মানুষ তাঁকে মনে রাখেন একজন দায়িত্বশীল, নৈতিক ও উদারচিত্ত ব্যক্তিত্ব হিসেবে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে পেশাগত দক্ষতা ও সমাজসেবার সমন্বয় একজন মানুষের জীবনকে সত্যিকারের প্রভাবশালী ও অনুপ্রেরণামূলক করে তোলে।

মোহাম্মদ তোহার জীবনগাথা বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প ব্যবস্থাপনা ও সমাজকল্যাণ খাতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর নেতৃত্ব, পেশাগত উৎকর্ষতা এবং মানবিক মূল্যবোধ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window