মোহাম্মদ রুহুল আমিন (৫ জুন ১৯৩৫ – ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর নায়ক, যিনি তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ ও অবিস্মরণীয় ত্যাগের জন্য মৃত্যুর পর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বীরত্ব পুরস্কার বীরশ্রেষ্ঠ-এ ভূষিত হন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একজন দক্ষ ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার নিঃস্বার্থ ও সাহসী ভূমিকা তাকে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
মোহাম্মদ রুহুল আমিনের জন্ম ১৯৩৫ সালের ৫ জুন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বাগপঞ্চরা গ্রামে। তাঁর পিতা মোহাম্মদ আজহার পাটওয়ারী এবং মাতাঃ জুলেখা খাতুন। ছোটবেলা থেকেই রুহুল আমিন ছিলেন মনোযোগী, দায়িত্বপরায়ণ ও স্বভাবগত সাহসী। গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি নৌবাহিনীতে যোগদান করে দেশসেবা ও পেশাদার জীবনের পথ বেছে নেন।
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন সার্চলাইট চালানোর পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই শুরু হয়। তখন মোহাম্মদ রুহুল আমিন পাকিস্তান নৌবাহিনী থেকে অবিলম্বে পদত্যাগ করেন, চট্টগ্রামের PNS Comilla ছেড়ে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন এবং স্থানীয় যুবক ও সৈন্যদের সংগঠিত করেন।
মে মাসে তিনি সেক্টর-৩-এ যোগ দেন মেজর কে এম শফিউল্লাহর নেতৃত্বে। পরবর্তীতে তিনি বঙ্গবন্ধু নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ পালাশ-এ ভর্তি হন এবং একসাথে পদ্মা ও পালাশ যুদ্ধজাহাজের স্কোয়াড্রন লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর কৌশল ও সাহস নৌবাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকের দিনগুলোতে, ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ, রূপসা নদী, খুলনা এলাকায় একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। জেষ্ঠর মুক্ত করার পর, বাংলাদেশের নৌবাহিনী ও ভারতীয় নৌবাহিনীর যৌথ বাহিনী পাকিস্তান নৌবাহিনী থেকে তিতুমীর নৌঘাঁটি দখল করার লক্ষ্যে এগোচ্ছিল।
এই সময়ে পালাশ এবং পদ্মা যুদ্ধজাহাজ দুটি ভুলক্রমে ভারতীয় বিমান বাহিনী-এর হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। পালাশ যুদ্ধজাহাজে কাজ করছিলেন রুহুল আমিন। হামলার ফলে জাহাজে অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়। জাহাজের ইঞ্জিন রুমে আগুন লাগার পর তিনি অন্যান্য নৌসদস্যদেরকে পরিত্যাগের আদেশ অমান্য করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন।
কিন্তু একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের ফলে তিনি আহত হন। জাহাজ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে নদীতে লাফ দেন এবং তীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। দুর্ভাগ্যবশত, তখন তাকে রেজাকারদের হাতে বন্দী করা হয় এবং তাঁকে বেয়নেট দিয়ে হত্যা করা হয়। এই সাহসী ত্যাগের কারণে মোহাম্মদ রুহুল আমিন চিরকালের জন্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক চিরস্মরণীয় বীর হয়ে থাকেন।
মোহাম্মদ রুহুল আমিনের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরজাগ্রত। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাদেশের নৌবাহিনী, সড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁকে স্মরণ করছে। উল্লেখযোগ্য:
-
বিএনএস শহীদ রুহুল আমিন – বাংলাদেশের নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ তাঁর নামাঙ্কিত।
-
Ro Ro Ferry Bir Shreshtha Ruhul Amin – ফেরি জাহাজ যা তাঁর নাম বহন করছে।
-
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সরণি – নীলফামারীর সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের একটি সড়ক।
-
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম – চট্টগ্রামে একটি ক্রীড়া স্টেডিয়াম।
এই স্মরণীয় নামগুলি শুধুমাত্র শারীরিক স্থানের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের চিরন্তন প্রতীক।
মোহাম্মদ রুহুল আমিনের পরিবারে ছিলেন তিন কন্যা এবং দুই পুত্র। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবারের জীবনের নিরাপত্তা অগত্যা ঝুঁকিতে থাকলেও তিনি দেশপ্রেমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। তার জীবন ও ত্যাগ নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন ছিলেন এক অকপট সাহসী সৈনিক, যিনি স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তার আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। রুহুল আমিনের জীবন প্রমাণ করে যে, সত্যিকারের বীরত্ব শুধু অস্ত্র চালানো নয়, বরং দেশ ও জনতার জন্য নিঃস্বার্থভাবে জীবন উৎসর্গ করাই বীরত্বের মূল কথা।
মোহাম্মদ রুহুল আমিনের স্মৃতি, সাহস ও দেশপ্রেম চিরকাল বাংলাদেশের হৃদয়ে অম্লান থাকবে।
source : wikipedia
Last modified: নভেম্বর ১৫, ২০২৫