মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম, জনবহুলভাবে পরিচিত কাজী শাহিদ ইসলাম পাপুল, ছিলেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ। তিনি লক্ষ্মীপুর-২ আসন (রায়পুর) থেকে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু কুয়েতে মানবপাচার, অর্থপাচার ও অবৈধ ভিসা ব্যবসা সম্পর্কিত অভিযোগে দণ্ডবিধিক মামলায় দোষী সাব্যস্থ হওয়ায় ২০২১ সালে এমপি পদ হারান।

শহিদ ইসলাম ২৮ মে ১৯৬৩ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম এবং মাতা তহুরুন নেছা। পাপুল পাঁচ ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে পঞ্চম সন্তান। শিক্ষাজীবনে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পর্যন্ত অর্জন করেছেন।

ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ দিয়ে, পাপুল কুয়েত-ভিত্তিক ‌“Marafie Kuwaitia Group” নামে একটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ছিলেন। তাঁর কোম্পানির ব্যবসায়ী পরিসর ছিল অনেক দিন যাবৎ শ্রম নিয়োগ, নিরাপত্তা ও ভিসা‑সংক্রান্ত কার্যক্রম বলে প্রতিবেদনে লেখা আছে।

২০২৩-এর আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল, কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে জয়লাভ করেন। তাঁর সংসদীয় কার্যকাল ছিল গুরুত্বপূর্ণ: নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশে আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং তাঁর অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক শক্তি অনেকেই নজর কাড়ে।

পারিবারিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দেয়া যায় — তাঁর স্ত্রী, সেলিনা ইসলাম, একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন‑৪৯ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০২০ সালের ৭ জুন, কুয়েতের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID) পাপুলকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সময় তাঁর বিরুদ্ধে মানব পাচার, অবৈধ ভিসা ব্যবসা এবং অর্থপাচারের অভিযোগ আনা হয়।  কীটপিপাসু শ্রমিকদের কাছ থেকে এক বড় অঙ্কে অর্থ নেওয়ার এবং তাদের অব্যাহতি করতে না দিয়ে তাদের বসবাস ও কাজের অবস্থা শोषণ করার অভিযোগও ছিল।

কুয়েতি আদালতে বিচার চলাকালীন, পাঁচজন বাংলাদেশি শ্রমিক অভিযোগ করেন যে তারা পাপুলের কমপক্ষে ৩,০০০ কুয়েতি দিনার প্রদান করেছিল কাজের প্রতিশ্রুতি পেতে, এবং নিয়মিতভাবে ভিসা নবায়ন করার জন্য অর্থ দিতে হত।এই মামলায় কুয়েতি বিচার বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করে এবং গ্রেফতারকৃত অবস্থায় বিচারহীনতার আশঙ্কা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দাবি ওঠে।

২০২১ সালের ২৮ জানুয়ারিতে কুয়েতের এক ফৌজদারি আদালত পাপুলকে চার বছরের কারাদণ্ড দেয় এবং ১.৯ মিলিয়ন কুয়েতি দিনার জরিমানা আরোপ করে।তবে এর পর আপিল আদালত তাঁর সাজা বাড়িয়ে সাত বছর কারাদণ্ড করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আরও জরিমানা নির্ধারণ করে। একই সঙ্গে তাঁর দণ্ডাদেশে অর্থ পাচারের দৃষ্টিকোণেও প্রমাণ মজুত ছিল।

শাস্তি পরবর্তীতে, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে, বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬ ও ৬৭ অনুযায়ী তাঁর জাতীয় সংসদের সদস্যপদ বাতিল করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে কুয়েতি আদালতের দণ্ডাদেশ এবং “নৈতিক অধঃপতনের” ধারা প্রয়োগ করে বাংলাদেশ সংসদ তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে।

শহিদ ইসলাম ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা মামলা করে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে অর্থপাচার মামলাসহ অভিযোগ দায়ের করে।CID-ও বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত করে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে মানবপাচার, ভিসা-কানুন উলঙ্ঘন এবং অর্থ পাচার।

বাংলাদেশে তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পদ গুলোর অনুসন্ধানও করা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি কুয়েতে অসংখ্য কোটি টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ব্যবসায়িক অংশীদারি গঠন করেছিলেন, যা তদন্তকারীদের নজরে আসে।

পাপুলের মামলা এবং দণ্ডাদেশ শুধুমাত্র এক ব্যক্তির পতন ছিল না — এটি বাংলাদেশি শ্রমিক রপ্তানির অন্ধ দিক এবং পাচার চক্রের একটি মর্মস্পর্শী উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় আসে। তাঁর কর্মকাণ্ড ও অবৈধ ব্যবহারের কারণে, অনেকেই এটিকে “শ্রম বিরূপ ব্যবসার রাজনীতি” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তার সংসদ জয় ছিল তাঁর অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিফলন, কিন্তু দোষ নিশ্চিত হয়ে এবং দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে, তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ন্যায্যতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে নতুন করে প্রজ্বলিত করেছেন।

Prothomalo

The Business Standard+1

The Business Standard

bdnews24.com

Times Kuwait

Gulf News

Wikipedia

প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window