ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আহমেদ (জন্ম ১৯৪৮, চর কমলাপুর, ফরিদপুর) ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম গর্বিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও পাইলট, যিনি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন — এটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্ব সম্মাননা। তাঁর জীবন টানিয়ে নেওয়া পরাক্রম, নেতৃত্ব ও সাহসিকতার গল্প আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছে বাংলাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে।
সাহাবুদ্দিন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ৩ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার সদর উপজেলার চর কমলাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ও মায়ের নাম লাইলী রশিদ। ছোটবেলা থেকেই সাহসী ও সংগ্রামী মনোভাবের অধিকারী ছিলেন তিনি। বাল্যকাল থেকে জীবনের বিভিন্ন বাস্তবতায় সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ার মানসিকতা তৈরী হয় তার মধ্যে — যা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯৬৭ সালে সাহাবুদ্দিন কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স অর্জন করেন এবং ১৯৬৮ সালের ২৯ এপ্রিল তৎকালীন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সে (PIA) বৈমানিক হিসেবে যোগ দেন। কর্মজীবনে তিনি দক্ষ ও দায়িত্বশীল পাইলট হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়ার আগে পেশাগত জীবনে ইতোমধ্যেই একজন প্রগতিশীল পাইলট হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর genocidal অভিযান শুরু হলে সাধারণ বাঙালির প্রত্যেকের হৃদয়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। এসব সময়ে সাহাবুদ্দিন তাঁর পরিবার রেখে ৭ এপ্রিল ১৯৭১-এ ভারতে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন সংগঠনিক কার্যক্রমে নিজেকে নিবেদিত করেন। তিনি বাংলাদেশ বাহিনীর আকাশসেনায় (বিখ্যাত Operation Kilo Flight) যোগ দেন এবং অসাধারণ দক্ষতায় যুদ্ধের বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নেন। BSS
Operation Kilo Flight ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অত্যন্ত বিশেষ একটি আকাশীয় অভিযান, যেখানে সীমিত প্রযুক্তি ও মানবশক্তি থাকার পরও বীর পাইলটরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। সাহাবুদ্দিন আহমেদ পূর্বে অভিজ্ঞতা থাকলেও হেলিকপ্টার চালাতে তাঁকে অল্প সময়ে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিল, এবং তাতেও তিনি অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেন।
মুক্তিযুদ্ধে তিনি প্রায় ১০টি গুরুত্বপূর্ণ মিশনে অংশ নেন। বিশেষ করে ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর নরসিংদীর রায়পুরা এলাকায় একটি মিশনে ভারতীয় প্যারাট্রুপার্সকে পাকিস্তানি বাহিনীর আগ্রাসনজনিত বিপদের মুখ থেকে উদ্ধারের সময় সাহাবুদ্দিন ও তাঁর টিম অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় হেলিকপ্টার নিচে নামিয়ে শত্রুর ওপর সফলভাবে হামলা চালান। এ অপারেশনে পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে কমপক্ষে ২০ জন নিহত ও আরও ২৪–২৫ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটায়, যা ঐ একটি মিশনে পাওয়া অসাধারণ সাফল্যের উদাহরণ।
এ ছাড়াও তিনি ৬ ও ৭ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার ও শমসেরপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায়ও বাহিরে এসে সফলভাবে মিশন পরিচালনা করেন — এগুলো প্রমাণ করে তার সাহসিকতা ও দৃঢ় মনোবল।
বাংলাদেশ সরকার অসাধারণ বীরত্ব ও বিপজ্জনক অবস্থায় অসাধারণ অবদান রাখার জন্য তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেন, যা দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্ব সম্মাননা। যুদ্ধের পর তিনি ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন এবং যুদ্ধকালে ব্যবহৃত বিমানগুলো বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে সংযুক্ত করার ব্যবস্থা করেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি নিজের পেশাগত জীবনে ফিরে যান এবং ২০০৭ সালে বাংলাদেশ বিমান লাইন্স থেকে অবসর নেন। অবসরগ্রহণের পরও তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সজীব রাখার উপরে জোর দেন এবং প্রজন্মকে ইতিহাসের মূল্য বোঝাতে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকারে অংশ নেন।
সাহাবুদ্দিন আহমেদ ১৬ অক্টোবর ২০২৫-এ ঢাকায় নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন; তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭। মৃত্যুতে তিনি স্ত্রী, এক পুত্র, এক কন্যা ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। তাঁর রাষ্ট্রীয় ফিউনারেল প্যারেডে রাষ্ট্রপতি ও বিমান বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব যথাযথ শ্রদ্ধা জানান। বাংলাদেশের আকাশ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তিনি এক অমলিন নক্ষত্রের মতো চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
সূত্র : BSS
প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।
Last modified: ডিসেম্বর ১১, ২০২৫