বীর প্রতীক মো. লনি মিয়া দেওয়ান (মৃত্যু: ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪) ছিলেন বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীরত্বগাথা রচনাকারী যোদ্ধা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অকুতোভয় নেতৃত্ব ও প্রত্যক্ষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে “বীর প্রতীক” খেতাবে ভূষিত করে। দেশের স্বাধীনতার পথে তাঁর সংগ্রাম আজও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

মো. লনি মিয়া দেওয়ানের জন্ম লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামে। তাঁর বাবা বছির উদ্দিন এবং মা ময়না বেগম—উভয়েই পরিশ্রমী ও নীতিবান মানুষ ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর স্ত্রীর নাম ফুল বানু। চার ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক ভালোবাসাপূর্ণ পরিবার। শৈশব থেকেই দায়িত্বশীল ও সাহসী স্বভাবের লনি মিয়া পরবর্তীতে সামরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন।

মো. লনি মিয়া দেওয়ান ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)—বর্তমান বিজিবিতে চাকরি করতেন। মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে তিনি চট্টগ্রাম ইপিআর সেক্টরে কর্মরত ছিলেন এবং হেডকোয়ার্টার কোম্পানির একটি প্লাটুনের দায়িত্বে ছিলেন। দেশব্যাপী যখন মুক্তিযুদ্ধের ডাক আসে, তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। চট্টগ্রামে প্রতিরোধ যুদ্ধের পর তিনি ১ নম্বর সেক্টরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং দলনেতা হিসেবে বীরত্বের পরিচয় দেন।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তীব্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিক পাহাড়তলী যুদ্ধের ঘটনাকে সুকুমার বিশ্বাস তাঁর “মুক্তিযুদ্ধে রাইফেলস ও অন্যান্য বাহিনী” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

অধিনায়কের নির্দেশে মো. লনি মিয়া দেওয়ান তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে পাহাড়তলীতে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী আকস্মিক হামলা চালালে তিনি ও তাঁর প্লাটুন প্রাণপণ লড়াই করেন। সারা রাত ধরে গোলাগুলির তীব্রতা বাড়তে থাকে।

২৫ মার্চ রাত ১১টায় বীর উত্তম রফিকুল ইসলামের নির্দেশে তিনি অবাঙালি সহযোগীদের আটক করে তাঁর প্লাটুনসহ পাহাড়তলী স্টেশনে অবস্থান নেন। ২৬ মার্চ মধ্যরাতে আবারো নির্দেশ পেয়ে তিনি প্লাটুনকে নিয়ে পাহাড়তলী রেলওয়ে বিল্ডিংয়ে প্রতিরক্ষাব্যূহ গঠন করেন। রাত ১০টার দিকে পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ এন এস জাহাঙ্গীর থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণ শুরু হলে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলতে থাকে। গোলাগুলির তীব্রতায় ইপিআর বাহিনীর অ্যামুনিশন প্রায় শেষের দিকে চলে আসে।

শত্রুপক্ষ আক্রমণের মাত্রা আরও বাড়ালে অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে রফিকুল ইসলামের নির্দেশে লনি মিয়া তাঁর প্লাটুনকে নিয়ে নিরাপদে কোতোয়ালী এলাকায় সরে যান। তাঁর নেতৃত্বেই সহযোদ্ধারা জীবিত থেকে পরবর্তী প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে সক্ষম হন।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসীম সাহসিকতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মো. লনি মিয়া দেওয়ান “বীর প্রতীক” উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, সংগ্রাম এবং ত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।

তথ্যসূত্র: wikipedia

শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window