রওশন সালেহা খানম ১৯২৯ সালে বাংলাদেশের সুধারাম উপজেলার বাটেয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম মৌলভী সায়েদুল হক এবং স্বামী মরহুম শেখ সলিমউল্যা চৌধুরী, যিনি পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার প্রতি তার গভীর আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়।
রওশন সালেহা খানমের শিক্ষাজীবন উজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ। ১৯৪৪ সালে উমা গার্লস স্কুল থেকে প্রথম শ্রেণীর বৃত্তিসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতার ব্রার্বোন কলেজ থেকে আই.এ. পাশ করেন। ১৯৫৩ সালে চৌমুহনী কলেজ থেকে বি.এ. এবং ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এড. ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষার প্রতি তার অগাধ আগ্রহ এবং অধ্যবসায় তাকে আরও উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা অর্জনের দিকে পরিচালিত করে। ১৯৬২-৬৩ সালে তিনি বৈরুতে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষা প্রশাসনের উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এড. ডিগ্রি অর্জন করেন।
রওশন সালেহা খানমের কর্মজীবন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং প্রভাবশালী। ১৯৪৭ সালে তিনি নোয়াখালী সরকারী এম-ই স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। পরে তিনি বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম খাস্তগীর গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা এবং মতিঝিল কেন্দ্রীয় সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫-৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার এবং পরে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে চাকুরি করেন। ১৯৭৮-৮১ সালে তিনি সহকারী জনশিক্ষা পরিচালক এবং ১৯৮১-৮৬ সালে উপ-জনশিক্ষা পরিচালক (প্রাইমারী) হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি ঢাকায় ইউনেস্কোর প্রাইমারী শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত আছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান শুধু স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ১৯৮২ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা পরিকল্পনার উপর সেমিনারে যোগদান করেন এবং শিক্ষানীতি ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের প্রচেষ্টা চালান। তার সামাজিক অবদানও অসামান্য। পাকিস্তান আমলে তিনি সমাজসেবা কাজে বিশেষ অবদানের জন্য ‘কুইন এলিজাবেথ করোনেশান মেডেল’ লাভ করেন।
রওশন সালেহা খানম শুধু একজন প্রশাসক বা শিক্ষাবিদই নন, তিনি একজন প্রাবল্যশালী লেখকও। তার লিখিত গ্রন্থ “অদ্ভুত পাঠশালা” শিশু শিক্ষার ওপর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষাপ্রণালীর উদ্ভাবনী ধারণা তুলে ধরে। তিনি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য চিরস্মরণীয় এবং অনুপ্রেরণার উৎস।
রওশন সালেহা খানমের জীবন শিক্ষাক্ষেত্রে নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষা প্রশাসন, গবেষণা ও সমাজসেবার এক চমৎকার সংমিশ্রণ। তার অধ্যবসায়, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রমাণ করে যে, একটি নিবেদিত জীবন কেবল ব্যক্তিগত সফলতা নয়, বরং সমাজ ও জাতির উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য অবদান রাখতে পারে। তিনি প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী এবং সমাজসেবীদের অনুপ্রেরণার অনন্য উৎস।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৫, ২০২৫