বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যারা দক্ষতা, জ্ঞান ও দেশভক্তির এক অনন্য সংমিশ্রণে নিজেদের স্থায়ী ছাপ রেখেছেন। রফিকউল্লাহ চৌধুরী ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম—একজন প্রখর বুদ্ধি, দৃঢ় নৈতিকতা ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অধিকারী সিভিল সার্ভেন্ট। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের দেখায় কীভাবে একজন মানুষ নিজের যোগ্যতা ও নিষ্ঠা দিয়ে দেশের সেবা করতে পারে।
রফিকউল্লাহ চৌধুরী ৮ই মে ১৯৩৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন চাটখিল উপজেলার সুরপুর গ্রামে। তাঁর পিতা মৌলভী আলহাজ্ব ফজলুর রহমান ছিলেন সৎ ও শিক্ষিত ব্যক্তি, যাঁর প্রেরণায় রফিকউল্লাহ ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার প্রতি মনোযোগী ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠেন। প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৫৭ সালে ইতিহাসে সম্মানসহ বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে তিনি একই বিষয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ১৯৬১ সালে সি.এস.পি. (Civil Service of Pakistan) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর শুরু হয় তাঁর সিভিল সার্ভিসে দীর্ঘ ও গৌরবময় যাত্রা। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি চট্টগ্রামের সহকারী কমিশনার, নেত্রকোনার এসডিও, ঢাকার এডিসি এবং বিডিএলজি-এর সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি পদে তিনি দক্ষতা, সততা এবং দূরদৃষ্টি প্রদর্শন করেছেন, যা তাঁকে দেশের প্রশাসনিক জগতে একটি স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
স্বাধীনতার পর তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি সরকারের নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে তিনি পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রশাসনিক কলেজের প্রকল্প পরিচালক এবং প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রফিকউল্লাহ চৌধুরী ছিলেন এক কালের তুখোড় বাগ্মী ও জাঁদরেল সিভিল সার্ভেন্ট। ১৯৫০-এর দশকে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতা সফর করেন এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ঢাকায় আনার উদ্যোগ নেন। তাঁর আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় এই দায়িত্বে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে তিনি সীমাহীন আগ্রহী ছিলেন। ১৯৬০ সালে লাহোর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং ১৯৭৯ সালে বৃটেনের বাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নয়ন প্রশাসনের উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আরও দৃষ্টিপ্রদানকারী ও প্রগতিশীল করে তোলে।
রফিকউল্লাহ চৌধুরীর জীবন শুধু সরকারি দায়িত্ব পালনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সবসময় সততা, নৈতিকতা এবং দেশের কল্যাণকে সর্বাগ্রে রেখেছেন। তাঁর নেতৃত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের প্রশাসনে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সহকর্মী ও ছাত্রদের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রেরণার উৎস।
দুর্ভাগ্যবশত, ১৪ই জুলাই ১৯৮৯ সালে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন জনাব রফিকউল্লাহ চৌধুরী। তাঁর অবদান, নিষ্ঠা এবং দেশপ্রেম আজও স্মরণীয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন প্রশাসক কেবল দায়িত্ব পালনে দক্ষ থাকলেই হবে না—নিষ্ঠা, সততা ও দূরদৃষ্টি থাকলে দেশের সেবা এক বাস্তব দৃষ্টান্তে পরিণত হতে পারে।
রফিকউল্লাহ চৌধুরীর জীবন ও কর্ম তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর সততা, কর্মদক্ষতা এবং প্রজ্ঞা আজও বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক অমলিন অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৫, ২০২৫