রবিউল হক (জন্ম: অজানা – মৃত্যু: ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে একজন অসাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য তার অবদান অমূল্য। সাহস, বীরত্ব এবং ত্যাগের প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করেছে। রবিউল হকের জীবন ও কর্ম শুধু তার গ্রামের জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য গর্বের উৎস।
রবিউল হক ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের উত্তর আনন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন আমিনউল্লা মজুমদার এবং মাতা ছাবেদা খাতুন। তিনি বিবাহিত ছিলেন মেহের আফরোজ বেগম-এর সঙ্গে এবং তাঁদের একটি ছেলে রয়েছে। পরিবার এবং গ্রামের মানুষদের কাছে তিনি একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সাহস তাকে জাতির চোখে চিরস্মরণীয় করে তুলেছে।
মুক্তিযুদ্ধের আগে রবিউল হক ইপিআরে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় তিনি যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। তিনি ময়মনসিংহ ইপিআর সেক্টরের অধীনে কর্মরত ছিলেন এবং প্রতিরোধযুদ্ধের পর ২ নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব সেক্টরে যুদ্ধ করেন। তিনি বিশেষত বিলোনিয়া, পরশুরাম এবং আরও কয়েকটি স্থানে সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ফেনী জেলার পাঠাননগরে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা বিলোনিয়া দখল করেন। পাকিস্তানি সেনারা পাঠাননগরে সমবেত হলে, মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ওপর প্রবল আক্রমণ চালান। পাকিস্তানি সেনারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পিছু হটতে বাধ্য হন এবং অসংখ্য গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালিয়ে যান। মুক্তিযোদ্ধারা এই ফেলে যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে পাঠাননগরের ক্যাম্পে রাখেন।
মুক্ত এলাকায় নিজেদের ক্যাম্প প্রহরায় ছিলেন রবিউল হক। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ক্যাম্পের পাশে রাখা ছিল শত্রুদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র। হঠাৎ ক্যাম্পের আশপাশে পড়তে থাকল গোলা। মুক্তিযোদ্ধারা বিভ্রান্ত হয়ে বুঝার চেষ্টা করলেন কোন দিক থেকে গোলা আসছে। জীবন রক্ষার্থে সবাই দ্রুত নিরাপদ অবস্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। রবিউল হকও নিরাপদ অবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন।
তখন তার একদম কাছেই পড়ে একটি বিস্ফোরিত গোলা। বিস্ফোরণের স্প্লিন্টার সরাসরি আঘাত হানে তার শরীরে। নিমেষেই রবিউল হকের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা ৬ ডিসেম্বর ফেনী মুক্তি অর্জন করলে, তারা অগ্রসর হন চট্টগ্রামের দিকে। এই সময় পলায়নরত পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের বিক্ষিপ্ত লড়াই হয়। এসব যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা দূর ও স্বল্প পাল্লার কামান দিয়ে গোলা নিক্ষেপ করলেও রবিউল হক তার সর্বোচ্চ সাহসিকতা প্রদর্শন করেছিলেন।
রবিউল হকের মরদেহ পরে সহযোদ্ধারা তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে সমাহিত করেন। পাঠাননগরের কাছেই অবস্থিত তার বাড়ি, যেখানে তার সমাধি চিহ্নিত আছে, তবে সংরক্ষিত নয়।
রবিউল হকের সাহসিকতা এবং দেশপ্রেমের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার তাঁকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে। খেতাবের সনদ নম্বর ছিল ২৫০। তিনি ফেনী জেলার ইতিহাসে একজন চিরস্মরণীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা।
রবিউল হকের জীবন প্রমাণ করে যে স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ, সাহস এবং আত্মনিয়োগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রমাণ করেছেন যে মুক্তিযুদ্ধ কেবল অস্ত্রের যুদ্ধ নয়, বরং মনোবল, নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগেরও লড়াই।
রবিউল হকের জীবন এবং বীরত্ব আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় দেশের স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ ছেলে, যিনি দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তার ত্যাগ ও সাহসিকতা আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে। রবিউল হকসহ সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসের কারণে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
রবিউল হকের গল্প শুধু ইতিহাস নয়; এটি একটি শিক্ষণীয় কাহিনী। দেশপ্রেম, সাহস এবং আত্মত্যাগের মিশ্রণে তার জীবন আমাদেরকে দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মূল্য বোঝায়। তার বীরত্ব আজও ফেনী জেলার মানুষ এবং পুরো জাতির হৃদয়ে জীবন্ত।
সূত্র : wikipedia
Last modified: এপ্রিল ১৩, ২০২৬