বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যরচনার ইতিহাসে রাজীব হুমায়ুন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি একই সঙ্গে একজন নাট্যকার, গীতিকার ও গবেষক। রেডিও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের একাধিক জনপ্রিয় নাটক এবং ভাষা-গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তাঁকে বিশেষভাবে সমাদৃত করেছে।

রাজীব হুমায়ুন ১৯৫১ সালে নোয়াখালীর সন্দ্বীপ উপজেলার মাইটডাঙা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন—যা বর্তমানে প্রশাসনিকভাবে চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত। সন্দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও সমুদ্রবেষ্টিত ভৌগোলিক অবস্থান তাঁর সৃষ্টিশীল ভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্য, সংগীত ও নাটকের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। লেখালেখির শুরু স্কুলজীবন থেকেই, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সাহিত্যজীবনের বিকাশ ঘটে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। নাট্যরচনায় তিনি মানবজীবনের নানামুখী সংকট, সামাজিক বৈষম্য এবং ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন বাস্তবসম্মত অথচ কাব্যিক ভাষায়।

বাংলাদেশ টেলিভিশন ও রেডিও বাংলাদেশের মাধ্যমে রাজীব হুমায়ুন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তাঁর রচিত বেতার নাটক ‘দিলাল রাজা’, যা ১৭শ শতকের সন্দ্বীপের কিংবদন্তি রাজা দিলাল রাজার জীবনের ওপর ভিত্তি করে লেখা, বাংলাদেশের বিভিন্ন বেতার কেন্দ্র থেকে একাধিকবার প্রচারিত হয়েছে। এই নাটকটি সন্দ্বীপের ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল হিসেবে বিবেচিত।

এর পাশাপাশি তিনি রচনা করেন ‘নীল পানিয়া’ নামে একটি টেলিভিশন নাটক, যা ১৯৮৬ সালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিশেষ নাটক হিসেবে প্রচারিত হয়। এটি তুফানপ্রবণ জনজীবন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানুষের সংগ্রামী মনোভাবের এক শৈল্পিক চিত্রায়ণ। নাটকটি দর্শকমহলে ব্যাপক প্রশংসা পায়।

শিক্ষাগতভাবে রাজীব হুমায়ুন একজন ভাষা–গবেষক। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তাঁর একাডেমিক আগ্রহ প্রধানত বাংলা ভাষার আঞ্চলিক উপভাষা ও সাহিত্য–সমালোচনাকে ঘিরে।

তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা–গ্রন্থ ‘Sociolinguistic and Descriptive Study of Sandipi: A Bangla Dialect’—বাংলা ভাষার সন্দ্বীপ উপভাষা নিয়ে করা একটি গভীর ভাষাবৈজ্ঞানিক গবেষণা। এটি বাংলা ভাষাতত্ত্বের জগতে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন, যেখানে তিনি উপভাষার গঠন, ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য, সামাজিক ব্যবহারের ধরন ইত্যাদি বিশ্লেষণ করেছেন।

রাজীব হুমায়ুন কেবল নাট্যকার বা গবেষকই নন, তিনি একজন সাহিত্য–সমালোচকও। তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘আবুল মনসুর আহমদের ব্যঙ্গরচনা’, যেখানে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রখ্যাত ব্যঙ্গরচয়িতা আবুল মনসুর আহমদের লেখনির ভাষাতাত্ত্বিক ও সমাজ–সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ করেছেন।

এই বইটি বাংলা ব্যঙ্গসাহিত্যের পাঠকদের কাছে একটি মূল্যবান সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এতে ব্যঙ্গরচনার শিল্পরীতি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও রস–উপাদানকে একাডেমিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

নাটক ছাড়াও রাজীব হুমায়ুন গান লিখেছেন, যার অনেকগুলো বাংলাদেশ বেতারে সম্প্রচারিত হয়েছে। তাঁর গীতিকবিতায় যেমন দেশপ্রেম ও মানবিকতা ফুটে ওঠে, তেমনি দেখা যায় গভীর দার্শনিক চিন্তাভাবনা। তিনি বিশ্বাস করেন, সংস্কৃতি হলো জাতিসত্তার মূল শক্তি, এবং সেই চেতনা তাঁর প্রতিটি লেখায় প্রতিফলিত।

রাজীব হুমায়ুন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এমন একজন প্রতিনিধি, যিনি ইতিহাস, ভাষা ও সমাজকে একই সূত্রে গেঁথেছেন। তাঁর রচনায় ঐতিহাসিক বাস্তবতা, সামাজিক সচেতনতা ও ভাষার সৌন্দর্যের মিশ্রণ তাকে অনন্য করেছে।

বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে তিনি এমন এক সময় কাজ শুরু করেন, যখন টেলিভিশন নাটক সামাজিক শিক্ষার শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠছিল। তাঁর নাটকগুলো শুধু বিনোদনের জন্য নয়, সমাজের অব্যক্ত কণ্ঠস্বর প্রকাশের এক মাধ্যম হয়ে ওঠে।

ড. রাজীব হুমায়ুন বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষাদান, গবেষণা ও সাহিত্যচর্চার ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি নিয়মিতভাবে নতুন লেখালেখি করে চলেছেন।

তাঁর সৃষ্টিশীলতা ও একাডেমিক গভীরতা প্রমাণ করে যে তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, বরং এক অনন্য সাংস্কৃতিক চিন্তাবিদ—যিনি ভাষা, ইতিহাস ও সাহিত্যকে একসূত্রে বেঁধে রাখেন।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window