রায়পুর উপজেলা: শিক্ষা, কৃষি, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক জনপদ

লক্ষ্মীপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী উপজেলা রায়পুর। শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও সংস্কৃতির অনন্য সংমিশ্রণে গঠিত এ জনপদে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য।

কৃষি
রায়পুরের মানুষের জীবিকা কৃষিনির্ভর। এখানে ভূমিমালিক ৫১.৯২ শতাংশ, ভূমিহীন ৪৮.০৮ শতাংশ। শহরে কৃষিজমির মালিকানা ৫১.৪৫ শতাংশ এবং গ্রামে ৫২.০৬ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব কৃষিজমি রয়েছে।
প্রধান ফসলের মধ্যে রয়েছে ধান, পাট, গম, আখ, সরিষা, আলু, সয়াবিন ও ভুট্টা। একসময় প্রচলিত কাউন, জোয়ার, তিল, তিসি, খেসারি ও কলাই এখন বিলুপ্তপ্রায়।
ফলের মধ্যে নারিকেল, সুপারি, আম, কাঁঠাল, কলা, আমড়া ও লেবু উল্লেখযোগ্য।

মৎস্য ও খামার শিল্প
উপজেলায় ৮টি মৎস্য খামার, ৭২টি হাঁস-মুরগির খামার, ৯টি হ্যাচারি ও ১৪টি দুগ্ধ খামার রয়েছে।

শিক্ষা
রায়পুরে শিক্ষার হার ৪২.৩ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষদের মধ্যে শিক্ষার হার ৪৪.৪ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৪০.২ শতাংশ। উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে ৭টি কলেজ, ৪৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১১৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২১টি মাদ্রাসা। এছাড়া ৫টি কওমি মাদ্রাসা রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য কলেজগুলোর মধ্যে রয়েছে— রায়পুর সরকারি কলেজ, রায়পুর মহিলা কলেজ, রুস্তম আলী ডিগ্রি কলেজ, হায়দরগঞ্জ মডেল কলেজ, প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী কলেজ, রায়পুর রেসিডেন্সিয়াল কলেজ ও ইউনাইটেড আইডিয়াল কলেজ।
কামিল মাদ্রাসার মধ্যে হায়দরগঞ্জ তাহেরিয়া আর এম কামিল মাদ্রাসা এবং রায়পুর কামিল মাদ্রাসা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

অর্থনীতি ও শিল্প
রায়পুরের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি প্রবাসী আয়। কৃষি এই অঞ্চলের দ্বিতীয় প্রধান আয়ের উৎস— যা প্রায় ৪৭.১৬ শতাংশ।
অন্যান্য আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে অকৃষি শ্রমিক ২.৮৫%, শিল্প ০.৭০%, ব্যবসা ১৪.০১%, পরিবহন ও যোগাযোগ ৪.১৪%, চাকরি ৯.৬৯%, নির্মাণ ২.২৮%, ধর্মীয় সেবা ০.৪৭%, রেন্ট ও রেমিট্যান্স ৮.৭১% এবং অন্যান্য ৯.৯৯%।
স্থানীয় শিল্পকারখানার মধ্যে রয়েছে ১টি টেক্সটাইল মিল, ৬২টি রাইস মিল, ২৫টি ফাওয়ার মিল, ১৪টি বিস্কুট ফ্যাক্টরি, ৭টি আইস ফ্যাক্টরি, ২টি বিড়ি ফ্যাক্টরি, ৩০টি স’মিল, ৫টি অয়েল মিল, ২৫টি ওয়েল্ডিং কারখানা, ১টি অ্যালুমিনিয়াম কারখানা ও ৪টি ইটভাটা।
কুটিরশিল্পের মধ্যে স্বর্ণকারগিরি, বাঁশ ও বেতের কাজ এখনো টিকে আছে।
প্রধান রপ্তানিপণ্য হলো নারিকেল, সুপারি, সয়াবিন, ধান ও ভুট্টা।

যোগাযোগ ব্যবস্থা
রায়পুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অনেক উন্নত। এখানে পাকা রাস্তা ৬৪ কিলোমিটার, আধা-পাকা ৫৯ কিলোমিটার এবং কাঁচা রাস্তা ৮২৭ কিলোমিটার। এছাড়া ৯৬.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধও রয়েছে।
একসময় পাল্কি ও গরুর গাড়ি ছিল এখানকার প্রধান বাহন, যা এখন ইতিহাসের অংশ।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব
এই উপজেলার কৃতী সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার জনাব মোহাম্মদউল্লাহ, রাজনীতিবিদ ও সাবেক এমপি হারুনুর রশিদ, বীরপ্রতীক মোহাম্মদ লনি মিয়া দেওয়ান, ইসলামি ব্যক্তিত্ব হাফেজ্জী হুজুর, সৈয়দ তাহের আহমাদ আল মাদানি (র.), এবং চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের খতিব সৈয়দ আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী আল মাদানি (হাফি.)।

দর্শনীয় স্থান
রায়পুরে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— হাজীমারা স্লুইচগেট, রায়পুর মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ডাকাতিয়া নদী, জ্বীনের মসজিদ, শায়েস্তা নগর জমিদার বাড়ি, রায়পুর বড় মসজিদ, চুন্নু মিয়া জমিদার বাড়ি, চরইন্দুরিয়ার আলতাফ মাস্টার মাছ ঘাট, হায়দরগঞ্জের সাজু মোল্লার ঘাট, সাইয়্যেদ মঞ্জিল, নুর মিয়া জামে মসজিদ (১৮৮২), এবং হায়দরগঞ্জ তাহেরিয়া রচিম উদ্দিন ঈদগাহ।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে স্থানীয় জমিদার রায়বাহাদুর মোহন রায়ের নামানুসারে এই এলাকার নামকরণ হয় “রায়পুর”। ১৮৭৭ সালে এটি থানা হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৮৩ সালে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হিসেবে ঘোষিত হয়। আজ আর জমিদারদের সেই আধিপত্য নেই, তবে রায়পুর এখনো তার ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধি নিয়ে গর্বিত।

সুত্র: wikipedia.org

লক্ষ্মীপুর: থানা থেকে জেলা, ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত পথচিত্র

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window