বাংলা নাট্যাঙ্গনের ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে অভিনয়, রচনা ও পরিচালনায় অবদান রেখে সংস্কৃতির আলোকিত ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। লাকী ইনাম সেই পেশাদার নাট্যশিল্পীদের অন্যতম। তিনি শুধু রেডিও, টেলিভিশন ও মঞ্চের নিয়মিত অভিনেত্রী নন, বরং নাট্যচর্চার নানা দিকের একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব।
লাকী ইনাম ১৯৫০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কলিমউল্লাহ ভূঁইয়া ছিলেন বিসিকের পরিচালক। পৈতৃক নিবাস পরশুরাম উপজেলার মুন্সীর হাটের শ্রীপুর গ্রাম। এই শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ পরিবারে বেড়ে ওঠার সুযোগ তাঁকে শিল্প ও শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করেছিল।
লাকী ইনাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স পাশ করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এস.এস. (মাস্টার্স ইন সোশ্যাল সায়েন্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি নাটকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন, যা তাঁর অভিনয়জীবনের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৭১ সাল থেকে লাকী ইনাম রেডিও এবং টেলিভিশনে নাটক করা শুরু করেন। তিনি নাগরিক নাট্য দলের সক্রিয় সদস্যা হিসেবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নাটকে অভিনয় করেন। এই দলের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি প্রায় শতাধিক নাটকে অংশগ্রহণ করেছেন এবং পাঁচটি নাটক নিজেই রচনা করেছেন।
রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে তিনি বাংলা নাট্যাঙ্গনে নিজস্ব স্থান করে নেন। তাঁর অভিনয়শৈলী সংবেদনশীল, বাস্তবধর্মী এবং চরিত্রের সাথে সম্পূর্ণ মিল রেখে ফুটে ওঠে।
লন্ডনে অবস্থানকালে লাকী ইনাম বিবিসি (BBC) ও কমনওয়েলথ ইনস্টিটিউশনে অভিনয় ও গান-সংক্রান্ত অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কাজ করার দক্ষতা দিয়েছে এবং বাংলা নাট্যশিল্পী হিসেবে তাঁর প্রফেশনালিজমকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
লাকী ইনাম মঞ্চ, রেডিও ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে বহু চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো ১৯৮৪ সালে ‘সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করা। এই পুরস্কার তাঁর প্রতিভা, নিষ্ঠা এবং দীর্ঘকালীন অভিনয় অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি।
লাকী ইনামের পরিবারও নাট্যজগতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তাঁর স্বামী ড. ইনামুল হক একজন বিশিষ্ট নাট্যকার। দম্পতির মিলিত প্রতিভা এবং সাংস্কৃতিক মনোভাব বাংলার নাট্যাঙ্গনের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
লাকী ইনাম শুধুমাত্র অভিনয় নয়, নাট্যচর্চার বিভিন্ন দিকেও অবদান রেখেছেন—নাটক রচনা, পরিচালনা ও অনুষ্ঠান আয়োজন। তিনি বিশ্বাস করেন, নাটক হলো সমাজের প্রতিফলন, যা মানুষের অনুভূতি ও চিন্তাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
তাঁর অভিনয়শৈলীতে চরিত্রের গভীরতা, সংলাপের প্রাঞ্জলতা এবং আবেগের সরলতা লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষার্থী থেকে প্রফেশনাল নাট্যশিল্পী, সকল পর্যায়ের দর্শক তাঁর অভিনয়কে গ্রহণ করেছেন আনন্দ ও প্রশংসার সাথে।
লাকী ইনাম বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের এক বহুমুখী শিল্পী। তিনি শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ নন, বরং নাট্যচর্চার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন—রচনা, পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। মঞ্চ, রেডিও ও টেলিভিশনের নিয়মিত কাজ এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় অভিজ্ঞতা তাঁকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটি অনন্য অবস্থান দিয়েছে।
তাঁর প্রতিভা ও নিষ্ঠা প্রমাণ করে, একজন নাট্যশিল্পী কিভাবে বাংলা সংস্কৃতির ধারাকে সমৃদ্ধ করতে পারে এবং প্রজন্মের কাছে শিল্প ও সংস্কৃতির অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ২২, ২০২৫