বাংলা ও ত্রিপুরার ইতিহাসে এক কিংবদন্তি নাম শমসের গাজী (১৭১২–১৭৬০)। ‘ভাটির বাঘ’ নামে পরিচিত এই শাসক ছিলেন শুধু এক যোদ্ধা নন, বরং কৃষকের মুক্তির প্রতীকও। ১৭৪৮ থেকে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনকালকে ত্রিপুরার মধ্যযুগীয় ইতিহাসের “সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়” হিসেবে উল্লেখ করেছেন ঐতিহাসিকরা।

জন্ম ও শৈশব

১৭১২ সালে ফেনীর কাছাকাছি কুঙ্গুরা গ্রামে এক কৃষক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শমসের গাজী। তাঁর পিতা ছিলেন পেয়ার (বা পীর) মুহাম্মদ খান এবং মাতা কাইয়ারা বিবি। অল্প বয়স থেকেই তিনি স্থানীয় জমিদার নাসির মাহমুদের অধীনে কাজ শুরু করেন। নাসির মাহমুদ ছিলেন রৌশনাবাদের জমিদার, যিনি নবাবের কাছ থেকে অর্থ প্রদানের বিনিময়ে শাসনাধিকার লাভ করেছিলেন। এই জমিদারের অধীনে থেকেই শমসের গাজীর প্রশাসনিক ও সামরিক দক্ষতার বিকাশ ঘটে।

শাসনকাল ও কৃষকের মুক্তি

১৮শ শতাব্দীতে যখন ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণ ও জমিদারদের অত্যাচারে কৃষকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, তখনই শমসের গাজী বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তিনি কৃষকদের উপর থেকে খাজনার বোঝা কমিয়ে দেন, অনেক ক্ষেত্রেই করমুক্তি ঘোষণা করেন। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি স্থিতিশীল হয় এবং দ্রব্যমূল্যও কমে আসে।

তিনি মুসলিম ও হিন্দু— উভয় সম্প্রদায়ের প্রতি ছিলেন সমান সদয়। তাঁর শাসনামলে অসংখ্য পুকুর খনন করা হয়, যার মধ্যে ‘কাইয়ার সাগর’ ছিল অন্যতম বৃহৎ। শিক্ষা বিস্তারে তিনি বেশ কিছু বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যার কেন্দ্র ছিল তাঁর রাজধানী জগন্নাথ সোনাপুর।

ত্রিপুরা জয় ও রাজনীতি

১৭৪৮ সালে ত্রিপুরার রাজা ইন্দ্র মানিক্যের ভাই কৃষ্ণ মানিক্য যখন রাজধানী উদয়পুর পুনর্দখলের চেষ্টা করেন, শমসের গাজী তাঁকে পরাজিত করেন। পরে দক্ষিণসিক ও মেহেরকুল পরগনা দখল করে তিনি কার্যত ত্রিপুরার শাসক হন। স্থানীয় রাজপরিবারের বিরোধিতা প্রশমনে তিনি উদয় মানিক্যের ভাই বনমালী ঠাকুরকে ‘লক্ষ্মণ মানিক্য’ নামে পুতুল রাজা হিসেবে বসান, যদিও প্রকৃত ক্ষমতা থাকে তাঁর নিজের হাতে।

তাঁর শাসন শক্তিশালী হলেও, অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র তাঁর পতনের পথ তৈরি করে। কৃষ্ণ মানিক্য পালিয়ে আগরতলায় গিয়ে নবাব মীর কাসিমের সহায়তা চান। মীর কাসিম শমসের গাজীকে ছলনার আশ্রয়ে গ্রেপ্তার করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহার’ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, তাঁকে কামানের মুখে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়।

শমসের গাজীকে কেউ কেউ ‘দস্যু’ বললেও, সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ন্যায় ও সমতার রক্ষাকর্তা। তাঁর শাসনে কৃষকরা পেয়েছিল নতুন জীবন, পেয়েছিল শোষণমুক্তির স্বাদ। এজন্যই তিনি আজও পরিচিত ‘ভাটির বাঘ’ নামে— একজন জনগণের রাজা, যিনি নিজের জীবন দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।

ইতিহাসের পৃষ্ঠায় শমসের গাজী শুধু এক যোদ্ধার নাম নয়; তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম দিকের সেই বিদ্রোহী, যিনি জনগণের অধিকারের জন্য রাজদরবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window