বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে শহীদ উদ্দিন আহমেদ সেলিম (২৩ জুলাই ১৯৫৩ – ৫ জানুয়ারি ২০২২) এক অনন্য নাম। খেলোয়াড়, অধিনায়ক, কোচ—সব ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার প্রতীক। দেশের ফুটবলের সোনালি যুগে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ জাতীয় দলে তাঁর অবদান এখনো আলোচিত।
১৯৮০ সালে কুয়েতে অনুষ্ঠিত এএফসি এশিয়ান কাপে বাংলাদেশ একমাত্রবারের মতো অংশ নিয়েছিল, আর সেই ঐতিহাসিক দলের অধিনায়ক ছিলেন সেলিম। ক্লাব পর্যায়ে তিনি সম্পূর্ণ ক্যারিয়ার কাটিয়েছেন ব্রাদার্স ইউনিয়নের সঙ্গে, যেখান থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ছিলেন দলের আত্মা ও নেতৃত্বের প্রতীক।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্রাদার্স ইউনিয়ন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ শেষে সেলিম নিজেই খেলোয়াড়দের সংগঠিত করেন এবং পাকিস্তানি কোচ আব্দুল গফুর বালুচকে নিয়ে আসেন দল পুনর্গঠনে। তাঁর বড় ভাই, প্রয়াত রাজনীতিক সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের মালিকানাধীন গোপীবাগের একটি ভবনে শুরু হয় তাদের অনুশীলন।
১৯৬৮ সালে ক্লাবে যোগ দিয়ে সেলিম এক দশকের বেশি সময় দলকে নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ১৯৭৩ সালে তৃতীয় বিভাগ, ১৯৭৪ সালে দ্বিতীয় বিভাগ এবং ১৯৭৫ সালে প্রথম বিভাগে উন্নীত হয়। প্রথম বিভাগে প্রথম ম্যাচেই তারা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আবাহনীকে হারিয়ে সাড়া ফেলে। ১৯৮০ সালে ফেডারেশন কাপ জয় এবং পরের বছর থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ব্যাংক এফসির সঙ্গে যৌথভাবে আগা খান গোল্ড কাপ জেতা ছিল তাঁর নেতৃত্বের আরও বড় সাফল্য।
জাতীয় দলে সেলিমের অভিষেক ঘটে ১৯৭৫ সালে মালয়েশিয়ার মারদেকা টুর্নামেন্টে। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক হন। ১৯৭৮ সালে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকেই জাতীয় দলের অধিনায়ক করা হয়। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ১৯৮০ সালের এএফসি এশিয়ান কাপে অংশ নেয়, যা আজও দেশের ফুটবলের অন্যতম গর্বের অধ্যায়।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে সেলিম কোচ হিসেবে দারুণ সফলতা দেখান। ১৯৯১ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নকে প্রথমবারের মতো এককভাবে ফেডারেশন কাপ জিতিয়ে ইতিহাস গড়েন। একই বছর দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ হিসেবে দলকে তৃতীয় স্থানে তোলেন এবং প্রথমবারের মতো ভারতকে পরাজিত করার কৃতিত্ব অর্জন করেন।
২০০০ সালের পর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সেলিম ব্রাদার্স ইউনিয়নের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন — কোচ, যুগ্ম সম্পাদক ও পরে সহ-সভাপতি হিসেবে।
দীর্ঘ সময় মুখগহ্বরের ক্যান্সারে ভুগে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। শহীদ উদ্দিন আহমেদ সেলিমের জীবন ছিল ফুটবলের প্রতি নিবেদন, যার ছায়া আজও বাংলাদেশের ফুটবলে জীবন্ত।
Last modified: নভেম্বর ৫, ২০২৫