বাংলার নারী জাগরণের ইতিহাসে কিছু নাম আলোকবর্তিকার মতো জ্বলজ্বল করে—তাদের অন্যতম শামসুন্নাহার মাহমুদ। তিনি ছিলেন লেখক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক ও নারী অধিকার আন্দোলনের পথিকৃৎ। বিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন নারীদের শিক্ষা ও কর্মজীবনে অংশগ্রহণ সীমিত ছিল, তখনই তিনি নিজের মেধা ও সাহসিকতা দিয়ে সমাজে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

১৯০৮ সালের দিকে ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার উত্তর গুঠুমা গ্রামে শামসুন্নাহার মাহমুদের জন্ম। তাঁর পিতা মোহাম্মদ নূরুল্লাহ ছিলেন মুনসিফ (বিচারক) এবং দাদা খান বাহাদুর আবদুল আজিজও ছিলেন সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি। পরিবারটি ছিল শিক্ষিত ও উদার চিন্তার ধারক, যা শামসুন্নাহারের চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর ভাই হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী পরবর্তীতে বাংলাদেশের খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক হিসেবে পরিচিতি পান।

শৈশবে শামসুন্নাহার পড়াশোনা শুরু করেন চট্টগ্রামের ড. খাস্তগীর গভর্নমেন্ট গার্লস’ স্কুলে। ১৯২৬ সালে তিনি প্রাইভেট প্রার্থী হিসেবে মেট্রিক পাস করেন। এরপর কলকাতার ডায়োসেসান কলেজ থেকে ১৯২৮ সালে আই.এ. এবং ১৯৩২ সালে বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪২ সালে তিনি বাংলা সাহিত্যে এম.এ. সম্পন্ন করেন, যা সে সময়ের নারী সমাজে বিরল অর্জন ছিল। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি নারী শিক্ষার প্রসার ও অধিকার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

শিক্ষাজীবন শেষ করে শামসুন্নাহার মাহমুদ শিক্ষকতা শুরু করেন কলকাতার লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে, যেখানে তিনি বাংলা সাহিত্য পড়াতেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নারীর অধিকার ও সমাজ সংস্কারে নিজেকে নিবেদিত করেন। তিনি ছিলেন নিখিল বঙ্গ মুসলিম মহিলা সমিতি (All Bengal Muslim Women’s Society)-এর সাধারণ সম্পাদক। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি মুসলিম নারীদের শিক্ষার সুযোগ ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য কাজ করেন।

১৯৫২ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিশু পুনর্বাসনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। ১৯৬১ সালে তিনি উদ্যোগ নেন “The Centre for the Rehabilitation of Disabled Children” প্রতিষ্ঠার—যা ছিল দেশের শিশু পুনর্বাসনের প্রাথমিক উদ্যোগগুলোর একটি।

শামসুন্নাহার মাহমুদ ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন—তিনি International Council of Women-এর সম্মেলনে কলম্বোতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে International Friendship Organization-এর এশিয়া আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯২৭ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ডা. ওয়াহিদুদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে, যিনি পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানের সার্জন জেনারেল হন। তাঁদের সংসারে দুই পুত্রসন্তান—মামুন মাহমুদ ও মঈনুদ্দিন মাহমুদ। মামুন মাহমুদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, আর মঈনুদ্দিন মাহমুদ ছিলেন ক্রীড়ানুরাগী ও ক্রিকেটার।

লেখালেখির মাধ্যমে শামসুন্নাহার মাহমুদ নারীদের আত্মচেতনা ও সাহিত্যচর্চায় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় শিশুতোষ পত্রিকা আঙ্গুর-এ। তিনি নওরোজআত্মশক্তি পত্রিকার নারী বিভাগ সম্পাদনা করেন। ভাই হাবিবুল্লাহ বাহারের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি ১৯৩৩ সালে কলকাতা থেকে বুলবুল নামে একটি সাহিত্যপত্র প্রকাশ করেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ:

  • পুণ্যময়ী (১৯২৫)

  • ফুলবাগিচা (১৯৩৫)

  • বেগম মহল (১৯৩৬)

  • রোকেয়া জীবনী (১৯৩৭) — এটি ছিল বেগম রোকেয়ার প্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনী

  • শিশুর শিক্ষা (১৯৩৯)

  • আমার দেখা তুরস্ক (১৯৫৬)

  • নজরুলকে যেমন দেখেছি (১৯৫৮)

তাঁর লেখাগুলোয় সামাজিক বাস্তবতা, নারীশিক্ষা ও মানবিক চেতনার গভীর প্রতিফলন দেখা যায়।

১৯৬৪ সালের ১০ এপ্রিল শামসুন্নাহার মাহমুদ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু ছিল দেশের নারী অগ্রযাত্রার এক বিশাল ক্ষতি। তবে তাঁর কাজ ও আদর্শ আজও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হয় “শামসুন্নাহার হল”—তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে সমাজসেবা ও নারী শিক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও প্রমাণ করে যে, শিক্ষা, অধ্যবসায় ও সাহসের মাধ্যমে একজন নারী সমাজে কতটা পরিবর্তন আনতে পারেন।

শামসুন্নাহার মাহমুদ ছিলেন কেবল একজন লেখক নন—তিনি ছিলেন এক চিন্তাশীল মানবতাবাদী, যিনি নারী সমাজকে আত্মনির্ভরশীল ও শিক্ষিত হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছিলেন। তাঁর সংগ্রাম, শিক্ষা ও সাহিত্য আজও বাঙালি নারীজাগরণের এক অমর প্রতীক।

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window