ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী (জন্ম: ৬ অক্টোবর ১৯৬৬) বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ২০১৩ সালের এপ্রিলে দেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত টানা এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়ে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সী ব্যক্তি যিনি এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হন।

দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত করেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (CPA) নির্বাহী কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশকে নতুন মর্যাদায় তুলে ধরেন।

Noakhali জেলার চাটখিল থানায় ১৯৬৬ সালের ৬ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন শিরিন শারমিন চৌধুরী। তাঁর বাবা রফিকুল্লাহ চৌধুরী পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা ছিলেন এবং ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মা নেয়ার সুলতানা ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য। শিক্ষিত ও প্রশাসনিক ঐতিহ্যপূর্ণ পরিবারে জন্ম হওয়ায় শৈশব থেকেই তিনি নেতৃত্ব, মানবতা ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধ ধারণ করেন।

শিরিন শারমিন চৌধুরী ১৯৮৩ ও ১৯৮৫ সালে যথাক্রমে এসএসসি এবং এইচএসসি সম্পন্ন করেন হোলি ক্রস গার্লস’ হাই স্কুল ও কলেজ থেকে।
পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৮৯ সালে এলএলবি এবং ১৯৯০ সালে এলএলএম ডিগ্রি লাভ করেন।

এরপর কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়ে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এসেক্সে উচ্চতর গবেষণায় অংশ নেন এবং ২০০০ সালে সংবিধান আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
২০১৪ সালের ১৬ জুলাই এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট (Honorary PhD) প্রদান করে।

আইন পেশায় যুক্ত হয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
আইনের বিভিন্ন শাখা—মানবাধিকার, সংবিধান, নারী অধিকার, বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা—এসব বিষয়ে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তিনি ২০০৭–০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনার পক্ষে লড়াই করা আইনজীবী দলের সদস্য ছিলেন।

২০০৯ সালের ২৪ মার্চ তিনি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে নারী সংসদ সদস্যদের সংরক্ষিত আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং নারীদের উন্নয়ন, অধিকার ও সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে মনোনীত করা হয়, যা দেশের ইতিহাসে প্রথম।
২০১৪ সালে রংপুর-৬ আসন থেকে উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে তিনি পুনরায় স্পিকার নির্বাচিত হন এবং টানা দুটি সংসদে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম ব্যক্তি হিসেবে রেকর্ড গড়েন।

২০১৪ সালে ক্যামেরুনের ইয়াউন্ডেতে অনুষ্ঠিত CPA নির্বাচনে তিনি চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন, যা কোনো বাংলাদেশি প্রথমবারের মতো অর্জন করেন। CPA-র ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে নতুন মর্যাদা লাভ করে।

স্পিকার ও CPA চেয়ারপার্সন হিসেবে তিনি বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য প্রদান করেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—

  • ২০১5 সালের ৯ মার্চ লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে কমনওয়েলথ ডে উপলক্ষে কুইন এলিজাবেথ দ্বিতীয়সহ রাজপরিবারের সদস্যদের সামনে তাঁর ভাষণ।

  • SDG Summit 2015-এ “Tackling inequality, empowering women and girls” সেশনে প্যানেল স্পিকার হিসেবে উপস্থিতি।

  • ভারত ও চীনের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক।

২০১০ সালে এশিয়া সোসাইটি তাঁকে Humanitarian Service Award প্রদান করে নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নারীদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্তকরণে তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার, সম্মেলন ও অ্যাকাডেমিক আলোচনায় নিয়মিত বক্তা হিসেবে অংশ নেন এবং নারীর অধিকার ও নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করেন।

২০১৫ সালে World Women Leadership Congress-এর পক্ষ থেকে তাঁকে Women Leadership Achievement Award প্রদান করা হয়।

আইনজ্ঞ ও গবেষক হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রবন্ধ ও কনসেপ্ট পেপার রচনা করেছেন।
তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য লেখাগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • Role of the Judiciary in the Development of Human Rights (1999)

  • Right to Life and Its Dimensions (2000)

  • Practice of Democracy: Importance of Free and Fair Election in Bangladesh

  • Regional Position Paper on Status of Women in South Asia

এছাড়াও তিনি Bangladesh Legal Decisions (BLD) আইনি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন (২০০৩–২০০৮)।

তিনি বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছেন সাইদ ইশতিয়াক হোসেনের সঙ্গে, যিনি একজন ফার্মাসিউটিক্যাল কনসালট্যান্ট। তাঁদের এক কন্যা ও এক পুত্রসন্তান রয়েছে।

সূত্র: wikipedia

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window