বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় এমন অনেক নাম আছে যারা সময়ের কণ্ঠস্বরকে পাণ্ডিত্য ও নিবেদন দিয়ে রচিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন বিশেষ অবদানকারী ছিলেন শেখ এ, টি, এম, রুহুল আমিন। গৌড়ের দ্বিতীয় ইলিয়াসশাহী বা মাহমুদ শাহী রাজবংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক রাজবংশ ‘শাহজাদ খানী’ সম্পর্কে তাঁর গভীর গবেষণা আজও সমকালীন ইতিহাসবিদ ও শিক্ষার্থীদের কাছে মূল্যবান।
শেখ এ, টি, এম, রুহুল আমিন জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৭ সালের ১৪ জানুয়ারি, ফেনী সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর গ্রামে। তিনি ছিলেন সামাজসেবী ও শিক্ষাবিদ মরহুম শেখ মজহারুল হক এবং মরহুমা হোসনে আরা খাতুন চৌধুরানী-এর একমাত্র সন্তান।
তিনি দ্বিতীয় ইলিয়াসশাহী (মাহমুদ শাহী) বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান নাসির শাহ্ তথা সুলতান মাহমুদ শাহ মাহি সওয়ারের (১৪৩৩-৬০) পুত্র সূফীশ্রেষ্ঠ মালিক আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ গৌড়ী ওরফে ‘শাহজাদ খান’ সাহেব-এর সরাসরি উত্তর পুরুষ। এই বংশকে ‘শাহজাদ খানী বংশ’ বলা হয়।
এই ঐতিহাসিক পটভূমি যুবজীবন থেকেই তাঁকে ইতিহাসচর্চার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। পূর্ব-পুরুষদের ইতিহাস সংরক্ষণ ও গবেষণার প্রতি এই আগ্রহই পরবর্তীতে তাঁর নিবেদিত গবেষণা জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
জীবনের শুরু থেকেই রুহুল আমিন নিজেকে দেশের প্রাচীন ইতিহাস, বিশেষ করে গৌড়ের দ্বিতীয় ইলিয়াসশাহী বা মাহমুদ শাহী রাজবংশ এবং ‘শাহজাদ খানী’ রাজবংশের ইতিহাস উদ্ধারে নিয়োজিত করেছিলেন। তিনি শুধু উৎসাহী গবেষক নন, বরং একজন পাণ্ডিত্যের পরিচয়সম্পন্ন ইতিহাসবিদ ছিলেন।
তাঁর গবেষণা ও প্রবন্ধগুলো বিভিন্ন দৈনিক, মাসিক ও গবেষণাধর্মী পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা হলো—
-
মাসিক মোহাম্মদী
-
সওগাত
-
আলহেরা
-
শতবর্ষ ফেনী
-
নোয়াখালী পৌরসভার শতবার্ষিকী
-
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য পত্রিকা
-
ডঃ এনামুল হক স্বরণে স্মারক গ্রন্থ
প্রায় সব প্রবন্ধেই রুহুল আমিনের গভীর পান্ডিত্য এবং প্রামাণ্য তথ্যের প্রতি নি:সন্দেহ নিষ্ঠা প্রকাশ পায়।
শেখ রুহুল আমিনের অবদান শুধু গবেষণাতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি দেশের ইতিহাসচর্চা ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি Central Board for Development of Bangali এবং Bangla Academy-কে একত্রিত করে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রথম সুপারিশ উপস্থাপন করেন।
এই সুপারিশের গুরুত্ব সরকার দ্রুত অনুধাবন করে এবং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় প্রতিষ্ঠান দুটি একত্রিত করার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এটি ছিল তাঁর গবেষণা ও প্রশাসনিক জ্ঞান ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
শেখ রুহুল আমিন নোয়াখালী জেলা পরিষদ, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি, বাংলা একাডেমী এবং Asiatic Society of Bangladesh-এর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি ইতিহাস-চর্চা ও সাহিত্যচর্চায় নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও নবীন গবেষকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন।
পেশাগত জীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসার হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এই দায়িত্বে তিনি শিক্ষাক্ষেত্রের নীতি, পরিকল্পনা এবং গবেষণার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
১৯৮৫ সালের ২৫ নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেখ এ, টি, এম, রুহুল আমিন ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু দেশের ইতিহাসচর্চা ও গবেষণার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
তাঁর গবেষণা, প্রকাশনা এবং সামাজিক অবদান আজও শিক্ষার্থীদের, গবেষকদের এবং ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য মূল্যবান। গৌড়ের দ্বিতীয় ইলিয়াসশাহী রাজবংশ এবং শাহজাদ খানী বংশের ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁর কাজ যুগান্তকারী।
শেখ এ, টি, এম, রুহুল আমিন ছিলেন এক নিবেদিত প্রাণ ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং সমাজসেবী। তাঁর জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে যে, উৎসর্গ, পাণ্ডিত্য এবং সমাজসেবার সমন্বয় একজন ব্যক্তিকে তার যুগের একটি অনন্য প্রতিভায় রূপ দিতে পারে। তিনি শুধু ইতিহাসের নথিপত্র সংরক্ষণ করেননি, বরং সমাজ ও শিক্ষাক্ষেত্রে তার প্রভাব রেখে গেছেন।
তাঁর প্রবন্ধ, গবেষণা ও সাংগঠনিক অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য ধন। বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চা ও জাতীয় প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের ক্ষেত্রে শেখ রুহুল আমিনের নাম চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ২০, ২০২৫