বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সাহিত্য জগতে কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা তাদের সৃষ্টিশীলতা, দক্ষতা এবং প্রচেষ্টা দিয়ে সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন। এ ধরনের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হলেন সিরাজুর রহমান, যিনি সাংবাদিকতা ও সাহিত্য, বিশেষ করে অনুবাদ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।

সিরাজুর রহমানের পৈতৃক নিবাস বেগমগঞ্জ উপজেলার আথিয়াপাড়া গ্রামে। তিনি একজন শিক্ষিত ও সংস্কৃতি-প্রেমী পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা মওলানা হাবিবুর রহমান এবং মাতা হাবিবুন্নেছা। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভাষা, সাহিত্য এবং গণমাধ্যমের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। এই আগ্রহই পরবর্তীতে তাঁকে সাংবাদিকতা ও অনুবাদ সাহিত্য জগতে প্রভাবশালী ভূমিকা নিতে প্রেরণা দেয়।

১৯৫০-এর দশকে সিরাজুর রহমান দৈনিক ইত্তেফাক-এ স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সে সময়ে তিনি খবর সংগ্রহ, প্রতিবেদনের কৌশল ও সাংবাদিকতার মূলনীতি শিখতে সক্ষম হন। তাঁর সততা, অধ্যবসায় এবং সাংবাদিকতা-প্রতিরূপ মনোভাব তাঁকে দ্রুতই পরিচিত করে তোলে।

এরপর তিনি বিবিসিতে সংবাদ পাঠক হিসেবে যোগদান করেন। এখানে তিনি আন্তর্জাতিক মানের সংবাদ পরিবেশন এবং সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচিত হন। বর্তমানে তিনি বাংলা অনুষ্ঠান উপস্থাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিকতা জীবনের এই দীর্ঘ পথ চলা তাকে পেশাদারিত্ব, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সাহায্য করেছে।

সিরাজুর রহমানের সাহিত্যিক অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে। তিনি বাংলায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করেছেন, যা পাঠক সমাজকে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত করেছে। তাঁর অনুবাদকৃত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে—

  • শার্লোট ব্রন্টির ‘জেন এয়ার’

  • জেন অস্টিনের ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’

  • চার্লস ডিকেন্সের ‘গ্রেট এক্সপেকটেশন’

  • আন্তন চেকভের ‘প্রতিশোধ’, ‘ভালুক’

  • হেনরিক ইবসেনের ‘পুতুলের ঘর’, ‘ভূত’, ‘বুনোহাঁস’

  • অসকার ওয়াইন্ডের ‘একান্ত তোমারি’

  • ফ্রিটজহক ওয়ালভারের ‘স্বখ্যাত সলিলে’

  • হেলেনা ইবম্যানের ‘প্রিয় হতে প্রিয়তর’

  • জে.বি. প্রিসলির ‘যে দিন পুলিশ এলো’

  • লেভ টলস্তয়ের ‘দুই পুন্যবান’

  • এবং ‘বিবিসির দৃষ্টিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পনের বছর’

এই অনুবাদকর্মগুলো বাংলাভাষী পাঠকদের আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করেছে। সিরাজুর রহমান শুধু অনুবাদক নন, বরং তিনি বাংলাভাষায় সাহিত্য সমৃদ্ধ করার এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

সিরাজুর রহমানের জীবন ও কর্ম দুই ক্ষেত্রেই পাঠক ও দর্শকের প্রতি দায়বদ্ধ। সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি তথ্যের প্রামাণিকতা ও সংবাদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, আবার অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে তিনি পাঠক সমাজকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, মানবিকতা ও চিন্তার প্রসার দিয়েছেন। তাঁর এই দুই দিকের কর্মকাণ্ড একত্রে তাঁকে একটি সংশ্লিষ্ট ও প্রভাবশালী সামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সিরাজুর রহমান বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য জগতে একজন অনন্য নাম। সাংবাদিকতা, উপস্থাপনা এবং অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা শুধু একটি প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সততা, শ্রম এবং সাহিত্যিক দক্ষতার সমন্বয় একজন মানুষকে সমাজের জন্য সত্যিকারের প্রভাবশালী করে তোলে।

সিরাজুর রহমানের জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়—সংবাদ পরিবেশন এবং সাহিত্যিক প্রচেষ্টা একই সাথে করলে সমাজের চিন্তাশীলতা, শিক্ষণীয়তা এবং মানবিকতা প্রসারিত করা সম্ভব।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window