বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সিরাজুল আলম খান—যিনি “দাদা”, “দাদাভাই” বা সংক্ষেপে SAK নামে বেশি পরিচিত—এক রহস্যময়, প্রভাবশালী এবং দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠকই নন, বরং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন, আদর্শিক লড়াই এবং জাতীয় প্রবাহের অন্যতম নিয়ামক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, দার্শনিক, সংগঠক এবং লেখক হিসেবে তাঁর যাত্রাপথ বহু অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে, যেগুলো আজও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু।
১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি নোয়াখালী জেলার এক শিক্ষিত পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা খোরশেদ আলম খান ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং ১৯৫৯ সালে তিনি ডেপুটি ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন হিসেবে অবসর নেন। পারিবারিক পরিবেশেই সিরাজুল আলম খান ছোটবেলা থেকে শৃঙ্খলা, শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মূল্যবোধে বড় হন।
১৯৫৬ সালে খুলনা জেলা স্কুল এবং ১৯৫৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে তিনি শিক্ষাজীবনের দুই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৬২ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর রাজনৈতিক উপলব্ধি, চিন্তাশীলতা ও নেতৃত্বের গুণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে।
১৯৫০–৬০-এর দশকে ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি গোপন সংগঠন, যার নাম স্বাধীন বাংলা বিপ্লবি পরিষদ—যা ইতিহাসে ‘নিউক্লিয়াস’ নামে অধিক পরিচিত। এই সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা। যদিও এই সংগঠনের তথ্য সরকারি নথিতে পাওয়া যায় না, তবুও জনপ্রিয় ইতিহাস, স্মৃতিচারণ ও গবেষকদের বিশ্লেষণে এর অস্তিত্ব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
নিউক্লিয়াস স্বাধীনতার পূর্ববর্তী প্রায় সব বড় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে থেকে কাজ করেছে—
-
ছয় দফা আন্দোলন,
-
একুশ দফা,
-
স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার নকশা,
-
জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণ,
-
এবং সর্বোপরি “জয় বাংলা” স্লোগান।
এমনকি শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি প্রদানের পেছনেও ছিল এই সংগঠনের ভূমিকা, যার মূল নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ আহমেদ ও আবদুর রাজ্জাক।
১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্ব ছাত্ররাজনীতিকে নতুন আদর্শ, শৃঙ্খলা ও মুক্তিযুদ্ধের সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা দেয়।
স্বাধীনতার প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে নিউক্লিয়াস তাদের সামরিক কাঠামো গড়ে তুলে, যার নাম ছিল জয় বাংলা বাহিনী। পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে এ বাহিনীকে পুনর্গঠন করে মুজিব বাহিনী (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স—BLF) নামে পরিচিত করা হয়।
এই বাহিনী গঠনে সিরাজুল আলম খান ছিলেন অন্যতম কৌশলবিদ ও সমন্বয়ক। তাঁর সঙ্গে কাজ করেন তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মনি ও আবদুর রাজ্জাক।
ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—
৭ মার্চ ১৯৭১-এর বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের লেখালেখি ও সম্পাদনার নেপথ্য টিমেও সিরাজুল আলম খানের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
এ ভাষণের রাজনৈতিক ভাষা, উত্তেজনা, দিকনির্দেশনা ও বার্তা প্রণয়নে তাঁর ভাবনার প্রভাব ছিল বলে অনেক গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
স্বাধীনতার ঠিক পরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে মতাদর্শিক বিভাজন তীব্রতর হয়। ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতৃত্বসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে।
এই সময় সিরাজুল আলম খান এবং শেখ ফজলুল হক মনির মধ্যে রাজনৈতিক দর্শন ও পন্থা নিয়ে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়। মনির রাষ্ট্র পরিচালনামুখী ধারা এবং সিরাজুল আলম খানের সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরমুখী চিন্তা একে অপরের বিপরীতমুখী হয়ে ওঠে।
এ মতবিরোধের ভিত্তিতেই সিরাজুল আলম খান গঠন করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)—যা বাংলাদেশের বাম-ঘরানার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। তাঁর মতে, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে হলে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর জরুরি ছিল।
১৯৭৫ সালে শেখ ফজলুল হক মনি তাঁকে বাকশালে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানালেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর জাসদের অন্য নেতাদের সঙ্গে তিনিও গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তী পাঁচ বছর কারাভোগ করেন (১৯৭৬—১৯৮১)।
কারামুক্তির পর তিনি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়েন এবং গণকণ্ঠ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন, যেখানে সমসাময়িক রাজনীতি, রাষ্ট্রদর্শন ও জাতীয় আদর্শ নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ প্রকাশিত হতো।
পরবর্তী সময়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় তাঁকে সরকারি স্থাপনায় সভা-সমাবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়—যা তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রমকে আরও সীমিত করে দেয়।
২০০৬ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লন্ডনে তাঁর বাইপাস সার্জারি হয়।
২০২৩ সালের ৯ জুন ঢামেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৮২ বছর।
তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে গভীর শোক নেমে আসে।
সূত্র: wikipedia
Last modified: নভেম্বর ১৭, ২০২৫